নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার-সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী পুনর্বহাল করে আপিল বিভাগের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, সংবিধানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হবে। তবে তা কার্যকর হবে আগামী চতুর্দশ সংসদ নির্বাচন থেকে।সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। রায়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হওয়ার কথা বলা হলেও এর জন্য সংবিধান সংশোধন করতে হবে। অথবা, পঞ্চদশ সংশোধনীর বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যে মামলা চলছে, তার রায়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোপুরি বাতিল হলে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন নাও হতে পারে।এদিকে পুরোনো তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ফেরত এলে সর্বশেষ অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতি প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু জুলাই সনদে বিচার বিভাগ এবং রাষ্ট্রপতিকে বাইরে রেখে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে একমত হয়েছিল দলগুলো। ফলে জুলাই সনদ অনুসরণ করতে হলে এ বিষয়ে সংসদে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।গত বছরের ২০ নভেম্বর সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণার প্রায় চার মাস পর ৭৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি ১২ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে সাত সদস্যের বেঞ্চ আপিল বিভাগের ওই রায়ের বিরুদ্ধে করা দুটি পৃথক সিভিল আপিল মঞ্জুর ও চারটি রিভিউ আবেদন নিষ্পত্তি করে সর্বসম্মতভাবে এ রায় দেন। পূর্ণাঙ্গ রায়ে এতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বৈধ ও সাংবিধানিক বলা হয়েছে।
রিভিউকারীদের একজনের আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া এ ক্ষেত্রে অন্তত তিনটি পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন। তিনি গতকাল সমকালকে বলেন, ত্রয়োদশ সংশোধনীতে বলা হয়েছে, সংসদ বিলুপ্তির ১৫ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধানে ১২৩ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে বিধান করা হয়েছে, সংসদ বিলুপ্তির পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুযায়ী, সংসদ বহাল থাকা অবস্থায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা সম্ভব নয়। তাই আগে সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ সংশোধন করতে হবে।পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে বিধান করা হয়েছে, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা লাভজনক পদ গ্রহণ করতে পারবেন না। এই অনুচ্ছেদ বহাল থাকায় ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুযায়ী অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বা উপদেষ্টা হতে পারবেন না।ত্রয়োদশ সংশোধনীতে সংবিধানের তৃতীয় তপশিলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বা উপদেষ্টাদের শপথ ফরম যুক্ত করা হয়েছিল। পঞ্চদশ সংশোধনীতে তা বাতিল করা হয়। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফেরাতে হলে শপথের বিধানও ফেরাতে হবে।
প্রসঙ্গত, পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একটি মামলা আপিল বিভাগের বিচারাধীন আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এই মামলায় হাইকোর্ট ছয়টি অনুচ্ছেদের সংশোধন বাতিল করেন। বাকিগুলো সংসদের হাতে ছেড়ে দেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়।আইনজীবীরা বলেছেন, যদি আপিল বিভাগ পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করেন, তাহলে ত্রয়োদশ সংশোধনী কার্যকরে বাধা থাকবে না। তা না হলে সংসদে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কার্যকরের পথ তৈরি করতে হবে।
জুলাই সনদে কী আছে
জুলাই সনদেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়ে বলা আছে। তাতে বিচার বিভাগ এবং রাষ্ট্রপতিকে বাইরে রেখে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে একমত হয়েছে দলগুলো।এতে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাবিত নাম থেকে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার, বিরোধীদলীয় ডেপুটি স্পিকার এবং তৃতীয় বৃহত্তম দলের প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত কমিটি প্রধান উপদেষ্টা বাছাই করবে।তা সম্ভব না হলে সরকারি দল পাঁচটি নাম দেবে, বিরোধী দল পাঁচটি নাম দেবে। তৃতীয় বৃহত্তম দল দুটি নাম দেবে। সরকারি দল, বিরোধী দল এবং তৃতীয় বৃহত্তম দলের নাম থেকে একজন করে বাছাই করবে।অনুরূপ বিরোধী দলও সরকারি দল ও তৃতীয় বৃহত্তম দলের নাম থেকে একজন করে বাছাই করবে। তার পর কমিটি ৪-১ ভোটে একজনকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করবে।এর পরও প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করা না গেলে কমিটিতে দুজন বিচারপতি যুক্ত হবেন। তারাও যদি অন্তত ৫-২ ভোটে বাছাই করতে না পারেন, তাহলে র;্যাঙ্ক চয়েজ ভোট পদ্ধতিতে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন করা হবে।