টিকিট বিক্রি ও অর্থ লেনদেনে স্বচ্ছতার অভাব এবং টাকা পাচারের অভিযোগ ওঠায় দক্ষিণ কোরিয়া রুটে পরিচালিত নন-সিডিউল যাত্রীবাহী চার্টার ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (সিএএবি)। কোরিয়ান এয়ারলাইনসগুলোর টিকিট বিক্রির পদ্ধতি, বাংলাদেশ থেকে কোরিয়ায় অর্থ স্থানান্তর এবং স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পাওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা ও আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো চার্টার ফ্লাইটের অনুমতি দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।এয়ার সার্ভিস এগ্রিমেন্ট থাকলেও দক্ষিণ কোরিয়া এখন পর্যন্ত ঢাকা-সিউল রুটে কোনো বিমান পরিচালনা করেনি। কৌশল হিসেবে তারা বিশেষ অনুমতি নিয়ে প্রায় নিয়মিতভাবেই চার্টার বিমান পরিচালনা করে আসছিল। এ ধরনের ফ্লাইট পরিচালনার আড়ালে অর্থ পাচার করে আসছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।অর্থপাচারের বিষয়টি নজরে এলে বেবিচক চেয়ারম্যান চলতি মাসের ২ তারিখে ফ্লাইট বন্ধের অনুমতি চেয়ে বিমান মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন। সংস্থার চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে নন-সিডিউল চার্টার ফ্লাইটে যাত্রী পরিবহন সংক্রান্ত টিকিট বিক্রি ও অর্থ লেনদেনের বিষয়টি অস্পষ্ট। জাতীয় স্বার্থে সাময়িকভাবে ফ্লাইট অনুমোদন স্থগিত রাখা হয়েছে।
জানা যায়, ১৯৭৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মধ্যে একটি এয়ার সার্ভিসেস এগ্রিমেন্ট (এএসএ) এবং একটি কনফিডেনশিয়াল মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং সিএমইউ স্বাক্ষর হয়। ওই চুক্তি অনুযায়ী উভয় দেশ একটি করে বিমান সংস্থাকে নির্ধারিত এয়ারলাইনস হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার সুযোগ পায়। সে সময় বাংলাদেশ সরকার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে মনোনীত করলেও দক্ষিণ কোরিয়া এখনও কোনো বিমান সংস্থাকে মনোনয়ন দেয়নি। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে সাপ্তাহিক ফ্লাইট ফ্রিকোয়েন্সি নির্ধারিত না হওয়ায় এ রুটে নিয়মিত শিডিউল ফ্লাইট চালু হয়নি।তবে কোভিড-১৯ মহামারীর সময় থেকে ২০২৩ পর্যন্ত কোরিয়ার জিন এয়ার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট চ্যানেলের মাধ্যমে ঢাকা রুটে রিপ্যাট্রিয়েশন ফ্লাইট পরিচালনা করে। পরে ২০২৩ সালে মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে কোরিয়ার আরেকটি এয়ারলাইনস এয়ার প্রিমিয়াকে তিন মাসের জন্য সপ্তাহে একটি করে নন-সিডিউল ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে এ ধরনের ফ্লাইটের পারমিট দেওয়ার দায়িত্ব সিএএবির ওপর ন্যস্ত করা হয়। সিএএবির অনুমতি নিয়ে এয়ার প্রিমিয়া ও টাওয়ে এয়ার নামের দুটি কোরিয়ান এয়ারলাইনস ঢাকা-কোরিয়া রুটে নন-সিডিউল যাত্রীবাহী চার্টার ফ্লাইট পরিচালনা করে আসছিল। অভিযোগ রয়েছে, চার্টার্ড বিমানের আড়ালে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করে আসছে কোরিয়ান এয়ারলাইনসগুলো। অথচ সংস্থাগুলোর ঢাকায় কোনো অফিস বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নেই। টিকিট বিক্রির টাকা কীভাবে হস্তান্তর হয়, তার তথ্য দিতে পারেনি এয়ারলাইনসগুলো।
সম্প্রতি এই দুই অপারেটরের বাংলাদেশি প্রতিনিধিদের সঙ্গে সভা করে সিভিল এভিয়েশন। সভায় চার্টার ফ্লাইটে টিকিট বিক্রির পদ্ধতি, বাংলাদেশ থেকে কোরিয়ায় টিকিটের অর্থ স্থানান্তর এবং স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু অপারেটরদের পক্ষ থেকে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।এই অবস্থায় গত মাসের ২৩ ফেব্রুয়ারি একটি চার্টার ফ্লাইটের আবেদন পাওয়ার পর সিএএবি এয়ারলাইনসগুলোর কাছে চার বিষয়ে তথ্য চায়। ই- মেইলে চাওয়া তথ্যের জবাবে টাওয়ে এয়ার জানায়, কোরিয়ায় একটি এজেন্সির মাধ্যমে টিকিট বিক্রি করা হয়। এর সঙ্গে ম্যান পাওয়ার প্রতিষ্ঠান বোসেল এবং ইপিএস কোরিয়ার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। অন্যদিকে এয়ার প্রিমিয়া দাবি করে, তারা বাংলাদেশে কোনো টিকিট বিক্রি করে না এবং বাংলাদেশ থেকে কোরিয়ায় কোনো অর্থও পাঠানো হয় না। বাস্তবে বাংলাদেশ থেকে যেসব যাত্রী এসব ফ্লাইটে কোরিয়ায় ভ্রমণ করছেন, তারা কীভাবে টিকিট সংগ্রহ করছেন বা কী ধরনের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ভ্রমণের সুযোগ পাচ্ছেন সে বিষয়ে এয়ারলাইনসগুলো স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেনি। সিএএবির চিঠিতে এসব বিষয় উল্লেখ করা হয়।
টিকিট বিক্রি ও অর্থ লেনদেনের বিষয়ে অসামঞ্জস্য থাকায় পুরো প্রক্রিয়াটি সন্দেহজনক বলে মনে করে সিভিল এভিয়েশন। সংস্থাটি বলছে, বিষয়টি বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং সরকারি বিধিবিধানের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে বিষয়টির সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ-দক্ষিণ কোরিয়া রুটে নন-সিডিউল চার্টার ফ্লাইট পরিচালনা স্থগিত থাকবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।সিএএবির জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ কাউছার বলেন, নানান অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কোরিয়া রুটে নন-সিডিউল ফ্লাইট পরিচালনা আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। অভিযোগের সুরাহা হলে নতুন করে অনুমতির বিষয়টি বিবেচনা করবে কর্তৃপক্ষ।