মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ নতুন করে বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলার মুখে ইরান পাল্টা হুমকি দিচ্ছে আর হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা বাড়ছে। এর মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ে টেলিফোনে কথা বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ;াদিমির পুতিন। যুদ্ধের বিস্তার, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং সম্ভাব্য কূটনৈতিক উদ্যোগ সব মিলিয়ে সংকট এখন এক নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ট্রাম্প-পুতিন ফোনালাপ : সংঘাত ও জ্বালানি বাজার : ক্রেমলিন জানিয়েছে, সোমবার ট্রাম্প নিজেই পুতিনকে ফোন করেন। চলতি বছরে দুই নেতার মধ্যে এটিই প্রথম ফোনালাপ। আলোচনায় ইরান যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার সম্ভাব্য উদ্যোগ, ইউক্রেন যুদ্ধের সামরিক পরিস্থিতি এবং বিশ্ব তেলের বাজারের অস্থিরতা নিয়ে কথা হয়।
ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, পুতিন ইরান ইস্যুতে সহায়তা করতে আগ্রহী। তবে তিনি পুতিনকে ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করার ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।অন্যদিকে পুতিন সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট সৃষ্টি করতে পারে। তার মতে, কৌশলগত নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে তেল সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্ববাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।তেলের বাজারে চাপ ও নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ভাবনা : যুদ্ধের কারণে তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার তেলের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কথা ভাবছে বলে জানিয়েছে রয়টার্সের সূত্র। এতে নির্দিষ্ট কিছু দেশকে, বিশেষ করে ভারতের মতো বড় ক্রেতাদের-রুশ তেল কেনার সুযোগ দেওয়া হতে পারে।ট্রাম্প বলেন, তেলের দাম কমাতে কিছু নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে তুলে নেওয়া হতে পারে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ভবিষ্যতে হয়তো নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজনও পড়বে না।
ইরানে ধারাবাহিক হামলা : গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া হামলার পর থেকে ইরানের বিভিন্ন শহরে বিস্ফোরণ ও বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। রাজধানী তেহরানসহ ইসফাহান, তাবরিজ ও আহভাজে হামলার খবর পাওয়া গেছে।মার্কিন প্রশাসনের দাবি, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে হাজার হাজার সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে এবং ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করা হয়েছে।মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিটার হেগসেথ বলেছেন, মঙ্গলবার ইরানে হামলার সবচেয়ে তীব্র দিন হতে পারে।এদিকে ইরান সরকারের বিভিন্ন বার্তায় বলা হচ্ছে, পাল্টা হামলা অব্যাহত থাকবে। ইরান দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এবং এই পর্যায়ে যুদ্ধবিরতির কোনো সম্ভাবনা নেই।
ইরানের কঠোর অবস্থান : ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে আপসহীন অবস্থান নিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ পরিকল্পনা ইতোমধ্যে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, সুস্পষ্ট লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখন আবাসিক এলাকাগুলোতে নির্বিচারে হামলা চালাচ্ছে।ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, যুদ্ধের সমাপ্তি কখন হবে তা নির্ধারণ করবে ইরানই। রেভল্যুশনারি গার্ডস কোরের বিবৃতিতে বলা হয়, (মধ্যপ্রাচ্য) অঞ্চলের সমীকরণ ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি এখন আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর হাতে; মার্কিন বাহিনী এ যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাতে পারবে না। হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা : বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে নৌপথ দিয়ে যায়, সেই হরমুজ প্রণালি এখন এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা চলতে থাকলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এক লিটার তেলও রপ্তানি হতে দেওয়া হবে না।এর জবাবে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, তেলের প্রবাহ বন্ধ করলে ইরানের ওপর ২০ গুণ বেশি শক্তিশালী হামলা চালানো হবে। তিনি আরও জানান, প্রয়োজনে মার্কিন নৌবাহিনী ট্যাংকারগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে এই নৌপথে চলাচল নিশ্চিত করবে।
ট্রাম্পকে ইরানের হুশিয়ারি : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকিকে উড়িয়ে দিয়ে ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি বলেছেন, তেহরান এসব হুমকিকে ভয় পায় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে লারিজানি লিখেছেন, ইরান আপনার ফাঁকা হুমকিকে ভয় পায় না। আপনার চেয়েও বড়রা ইরানকে নির্মূল করতে পারেনি। নিজের প্রতি খেয়াল রাখুন যেন নির্মূল হয়ে না যান!
হরমুজ প্রণালি দখলে নেওয়ার চিন্তাভাবনা করছেন ট্রাম্প : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজকে বলেছেন, তার প্রশাসন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিটি নিজেদের দখলে নেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে। ট্রাম্প বলেন, হরমুজ প্রণালিটি বর্তমানে উন্মুক্ত রয়েছে, তবে হোয়াইট হাউস এটি দখলে নেওয়ার কথা ভাবছে এবং সেখানে তারা অনেক কিছুই করতে পারে।
নেতানিয়াহুর বক্তব্য : অভিযান শেষ হয়নি : এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান এখনও শেষ হয়নি।মৃত্যু বা আহত হওয়ার গুঞ্জনের মধ্যেই তিনি একটি কমান্ড সেন্টার পরিদর্শন করে বলেন, ইসরায়েল ইতোমধ্যে ইরানের সামরিক সক্ষমতায় বড় আঘাত হেনেছে এবং অভিযান অব্যাহত থাকবে। যুদ্ধবাজ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বলেন, আমরা চাই, ইরানি জনগণ স্বৈরশাসনের শিকল ছুড়ে ফেলে দিক। শেষ পর্যন্ত এটি তাদের ওপরই নির্ভর করছে। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আমরা তাদের হাড়গোড় ভেঙে দিয়েছি। আমাদের অভিযান এখনও শেষ হয়নি।
বাহরাইনে মার্কিন সেনাদের অবস্থান করা হোটেলে ইরানের হামলার দাবি : বাহরাইনের একটি হোটেলে সফল ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। ওই হোটেলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করছিলেন। তেহরান টাইমসের প্রতিবেদনে এ হামলায় ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
যুদ্ধের ভবিষ্যৎ : যুদ্ধের মাঝেই কূটনৈতিক উদ্যোগের ইঙ্গিত মিললেও বাস্তবে সংঘাত কমার লক্ষণ এখনও স্পষ্ট নয়। ট্রাম্প দাবি করছেন, যুদ্ধ শিগগির শেষ হতে পারে এবং রাশিয়া এতে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু ইরান জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় বসার কোনো পরিকল্পনা নেই।বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও তেল সরবরাহের ভবিষ্যৎই এখন এই যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হয়ে উঠেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতির ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।