চলতি ফেব্রুয়ারির ২৭ দিনে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১০ বার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। অধিকাংশ কম্পনের মাত্রা মৃদু থেকে মাঝারি হলেও ঘন ঘন এ ভূকম্পন মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার দুপুরে মাঝারি মাত্রার একটি ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ রাজধানী ঢাকা এবং প্রতিবেশী ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিভিন্ন এলাকা।আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র জানিয়েছে, শুক্রবার দুপুর ১টা ৫২ মিনিট ২৪ সেকেন্ডে এ ভূমিকম্প আঘাত হানে। উৎপত্তিস্থল ছিল সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা। রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৪। উৎপত্তিস্থলের গভীরতা ছিল প্রায় ৩৫ কিলোমিটার এবং ঢাকার আগারগাঁও ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে এর দূরত্ব ছিল প্রায় ১৮৮ কিলোমিটার।আবহাওয়াবিদ ফারজানা সুলতানা জানান, এটি মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প। পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াত কবীরও এটিকে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস অবশ্য উৎপত্তিস্থলে কম্পনের মাত্রা ৫ দশমিক ৩ বলে নিশ্চিত করেছে।
ভূমিকম্পের ঝাঁকুনি সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়েছে সাতক্ষীরা, খুলনা, যশোর, ঝিনাইদহসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে। জুমার নামাজের সময় হওয়ায় তখন অনেক মানুষ মসজিদে অবস্থান করছিলেন। হঠাৎ কম্পনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকে দ্রুত ভবন ছেড়ে খোলা জায়গায় চলে যান।সাতক্ষীরা শহরের কাটিয়া এলাকার মুদি দোকানি আতিকুর শেখ বলেন, নামাজ শেষে দোকানে এসে দেখেন জিনিসপত্র কাঁপছে। পরে তিনি বুঝতে পারেন ভূমিকম্প হয়েছে। পলাশপোল এলাকার বাসিন্দা ও সাবেক ফিফা রেফারি তৈয়ব হাসান বাবু বলেন, জুমার নামাজের সময় হঠাৎ তীব্র ঝাঁকুনি শুরু হলে সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। আশাশুনি উপজেলার আনুলিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রুহুল কুদ্দুস জানান, ভূমিকম্পে এলাকায় একটি মন্দির ও একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েকটি ভবনে ফাটল দেখা গেছে। শ্যামনগরের বিভিন্ন এলাকায় মাটির ঘর ধসে পড়েছে। দৌড়াদৌড়ির সময় তিনজন আহত হয়েছেন।সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক আফরোজা আখতার বলেন, জেলার আশাশুনি, শ্যামনগর ও কালীগঞ্জে কিছু অঞ্চলে ক্ষতি হয়েছে। এসব এলাকার কিছু বাড়িঘরে ফাটল ও দেয়াল ধসে গেছে। এ ছাড়া কয়েকটি মসজিদ, মন্দির ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধসে পড়েছে। এ মুহূর্তে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সঠিক নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি।যশোর শহরেও তীব্রতা ছিল উল্লেখযোগ্য। জজকোর্ট মসজিদের মুসল্লি আব্দুল হালিম বলেন, নামাজের মধ্যে হঠাৎ পুরো ভবন কেঁপে ওঠে। এমন ঝাঁকুনি তিনি আগে অনুভব করেননি।খুলনা, ঝিনাইদহ ও আশপাশের জেলাগুলোতেও একই ধরনের কম্পন অনুভূত হয়। অনেক জায়গায় ভবনের দেয়ালে ছোটখাটো ফাটল দেখা গেছে। তবে বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।রাজধানী ঢাকায়ও কয়েক সেকেন্ড ধরে কম্পন অনুভূত হয়। অনেক বহুতল ভবনের বাসিন্দা আতঙ্কিত হয়ে দ্রুত নিচে নেমে আসেন।এ কম্পন পশ্চিমবঙ্গের কলকাতাসহ বিভিন্ন জেলায়ও অনুভূত হয়। কলকাতার বিভিন্ন বহুতল ভবনের বাসিন্দারা আতঙ্কিত হয়ে বাইরে চলে আসেন। কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী কম্পনে অনেক ভবন দুলে ওঠে বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।
চলতি মাসে দেশে একাধিক ভূমিকম্প হয়েছে। এর মধ্যে ৩ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমার অঞ্চলে উৎপত্তি হওয়া ৫ দশমিক ৯ ও ৫ দশমিক ২ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি সিলেট অঞ্চলে দুটি ভূমিকম্প হয়। ১৯ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলায় ৪ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ২৬ ফেব্রুয়ারি ভারতের সিকিম অঞ্চলে উৎপত্তি হওয়া ৪ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্প ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় অনুভূত হয়। এর আগের দিন মিয়ানমারে উৎপত্তি হওয়া ৫ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্পও দেশে অনুভূত হয়।ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘন ঘন ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, ছোট ছোট ভূমিকম্প শক্তি সঞ্চয়ের লক্ষণ হতে পারে। এ অঞ্চলে বড় ভূমিকম্পের শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, বঙ্গোপসাগর ও আশপাশের এলাকায় সক্রিয় ফল্ট রয়েছে। সাতক্ষীরা ওই অঞ্চলে। এ জন্য বছরে এক-দুটি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল থাকে এ জেলায়। তবে এবার সবচেয়ে বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। তিনি বলেন, অতীতে বড় ভূমিকম্পের আগে অনেক ছোট কম্পন হয়েছে। এটি বড় দুর্যোগের আগাম সংকেতও হতে পারে। তাই সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।ভূতত্ত্ববিদদের মতে, বাংলাদেশের নিচে অন্তত ১৩টি সক্রিয় ফল্ট লাইন রয়েছে। এর মধ্যে সিলেট-আসাম অঞ্চলের ডাউকি ফল্ট এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অঞ্চলের সাবডাকশন জোন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। ১৮৯৭ সালে ডাউকি ফল্টে ৮ দশমিক ৭ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছিল। এ ছাড়া ১৮৮৫ সালে ঢাকার কাছে মানিকগঞ্জ এলাকায় ৭ দশমিক ৫ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের ইতিহাস রয়েছে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল নির্মাণ ব্যবস্থা এবং ঘনবসতির কারণে ঢাকা বড় ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শহরগুলোর একটি। ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে ক্ষতি কমাতে এখনই প্রয়োজন কার্যকর প্রস্তুতি, ভূমিকম্প সহনীয় ভবন নির্মাণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি।