জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের রাজনীতিতে এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার পরিসংখ্যানে। এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের মধ্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীর হার অতীতের যে কোনো নির্বাচনের তুলনায় সর্বোচ্চ। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা সংসদীয় রাজনীতিতে যুক্তি, তথ্য ও প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্তের জায়গা আরও দৃঢ় করতে পারে। প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে- নির্বাচনে মোট প্রার্থীর ৭৬.৪২ শতাংশই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। এর মধ্যে ২৮.৩৭ শতাংশ স্নাতক এবং ৪৭.৯৮ শতাংশ স্নাতকোত্তর বা তার চেয়ে উচ্চতর ডিগ্রিধারী। নবম থেকে আসন্ন ত্রয়োদশ এই পাঁচটি নির্বাচনের তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, উচ্চশিক্ষিত প্রার্থীর হার এবারই সর্বোচ্চ। সম্প্রতি প্রকাশিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত হলফনামায় প্রার্থী পরিচিতি শীর্ষক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য।রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সম্ভাব্য বাঁক : রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. মির্জা এম হাসান মনে করেন, এই পরিসংখ্যান নিছক সংখ্যার হিসাব নয়, বরং রাজনীতির ভাষা ও আচরণ বদলের ইঙ্গিত। যখন সংসদে উচ্চশিক্ষিত প্রতিনিধির সংখ্যা বাড়ে, তখন আইন প্রণয়ন আর বক্তৃতানির্ভর থাকে না- তা তথ্য, গবেষণা ও যুক্তির ওপর দাঁড়াতে শুরু করে। এতে রাষ্ট্র পরিচালনার মান উন্নত হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়।
তিনি বলেন, শিক্ষার প্রভাব রাজনীতিতে দৃশ্যমান হতে সময় লাগলেও এর সামাজিক প্রভাব গভীর। উচ্চশিক্ষিত রাজনীতিবিদরা সাধারণত ভিন্নমত সহ্য করতে পারেন, প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম মানতে আগ্রহী হন। এটি রাজনৈতিক সহিংসতা কমানো ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি শক্তিশালী করার সহায়ক।অন্যান্য শিক্ষাগত যোগ্যতার চিত্র: উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পাস প্রার্থীর হার ৮.৯৪ শতাংশ এবং মাধ্যমিক (এসএসসি) পাস প্রার্থী ৬ শতাংশের কিছু বেশি। পাশাপাশি নিম্ন-মাধ্যমিক ও স্বাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন প্রার্থীর উপস্থিতিও রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক অঙ্গনে উচ্চশিক্ষার প্রতি ঝোঁক স্পষ্ট হলেও এই বৈচিত্র্য নির্বাচনের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র বজায় রাখছে।সাধারণ নাগরিকের প্রত্যাশা : রাজধানীর রামপুরা এলাকার বাসিন্দা উপাধ্যক্ষ নূরুজ্জামান হীরা বলেন, সংসদে যদি শিক্ষিত মানুষ না যান, তা হলে জটিল জাতীয় সমস্যা নিয়ে আলোচনা কীভাবে হবে? আমরা চাই কথা নয়, কাজের সংসদ।একজন গ্রামীণ ভোটার সৈয়দ আহমদ পাটওয়ারী বলেন, শিক্ষা মানেই সব ভালো- এমন নয়। কিন্তু অশিক্ষিতের সিদ্ধান্তে দেশের ক্ষতি হয়, এটা আমরা বহুবার দেখেছি।এবার আমরা যোগ্যতা দেখতে চাই।একটি বেসরকারি কলেজের শিক্ষক নূপুর বিশ^াস বলেন, যারা নিজেরা উচ্চশিক্ষার মধ্য দিয়ে গেছেন, তারা শিক্ষা খাতের সংকট, গবেষণার প্রয়োজন ও মানবসম্পদ উন্নয়নের গুরুত্ব সহজেই বুঝবেন। সংসদে এমন কণ্ঠ দরকার।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী মো. আল-আমিন বলেন, তরুণদের কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ অর্থনীতি বোঝার জন্য শিক্ষিত নেতৃত্ব অপরিহার্য। এই পরিসংখ্যান আমাদের কিছুটা আশাবাদী করছে।বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে প্রার্থীদের গড় বয়স ৫১ বছর হলেও শিক্ষিত ও তুলনামূলক তরুণ প্রার্থীর অংশগ্রহণ ভোটারদের বিবেচনায় নতুন মাত্রা যোগ করছে। ভোটাররা এখন আর শুধু প্রতীক বা পরিচয়ে ভোট দেন না। প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সক্ষমতা গুরুত্ব পাচ্ছে। এটি গণতন্ত্রের পরিণতির দিকেই ইঙ্গিত করে।সার্বিকভাবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উচ্চশিক্ষিত প্রার্থীর রেকর্ড উপস্থিতি দেশের রাজনীতিতে একটি সম্ভাব্য মোড় বদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই প্রত্যাশা বাস্তবে কতটা রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে ভোটারদের সচেতন সিদ্ধান্ত এবং নির্বাচনের পর সংসদের আচরণ ও কার্যকারিতার ওপর।