NEWSTV24
বাগযুদ্ধ রূপ নিচ্ছে পেশিশক্তিতে
বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬ ১৫:২২ অপরাহ্ন
NEWSTV24

NEWSTV24

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই ভোটের মাঠ সহিংস হয়ে উঠছে। নির্বাচনী প্রচারের ভাষা ও আচরণ অনেক এলাকায় সংঘর্ষ, হামলা ও পাল্টা হামলায় রূপ নিয়েছে। গত সাত দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে অর্ধশতাধিক রাজনৈতিক সংঘর্ষে আহত হয়েছেন বহু মানুষ। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোয় বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা সবচেয়ে বেশি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নারী কর্মীদের হেনস্তা, গণসংযোগে বাধা ও মামলা-পাল্টা মামলার ঘটনা। সব মিলিয়ে সাধারণ ভোটারের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। ভোটকেন্দ্রে যাওয়া নিয়েও আস্থা হারাচ্ছেন। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেসব এলাকায় বেশি, সংঘর্ষের শঙ্কাও সেসব এলাকায় বেশি।অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, মুখে গণতান্ত্রিক বললেও রাজনীতি এখনও পেশিশক্তির কবল থেকে বের হতে পারেনি। যে জায়গায় হোঁচট খাচ্ছি, ২০২৪ সালের ঘটনা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করতে পারেনি। প্রতিযোগিতা এখন প্রতিহিংসায় পরিণত হচ্ছে। তিনি বলেন, এই ধরনের সংঘাত-সহিংসতার ঘটনায় শুধু শোকজ না করে আইনের কঠোর প্রয়োগ বাস্তবায়ন করতে হবে। শাস্তি দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। কয়েকজনকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে পারলে অন্যরাও ভোটের মাঠের সহিংসতা থেকে বেরিয়ে এসে মানুষের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল হবে। তিনি বলেন, মানুষের জীবনের মূল্যের চেয়ে ভোটের মূল্য বেশি না। ভোটকেন্দ্রে নিতে হলে ভোটারদের আশ্বস্ত করতে হবে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ২২ জানুয়ারি থেকে নির্বাচনী প্রচার শুরু হওয়ার পর থেকে গতকাল পর্যন্ত সাত দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে অর্ধশতাধিক সংঘর্ষ-সহিংতার ঘটনা ঘটেছে। যারঅধিকাংশই বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের। গতকাল ঢাকা, চট্টগ্রাম, শেরপুর, ফরিদপুর, শরীয়তপুর, ভোলাসহ অন্তত সাতটি স্থানে ভোট নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এর আগে রাজধানীর খিলক্ষেত, নাটোর-১ আসনের লালপুর-বাগাতিপাড়া, লালমনিরহাট-১ আসনের হাতীবান্ধা, চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের আলমডাঙ্গা, ময়মনসিংহ-১১ আসনের ভালুকা, পটুয়াখালী-৩ আসনের গলাচিপা-দশমিনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, অতীতের অনেক নির্বাচনের চেয়ে এবারের নির্বাচনে মাঠের পরিবেশ অত্যন্ত চমৎকার। এরই মধ্যে কয়েকজন প্রার্থী ও তাদের কর্মীদের ওপর হামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছি। পাশাপাশি গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে যে বিষয়গুলো আসছে, তাৎক্ষণিকভাবে কমিশন তা রিটার্নিং অফিসারদের নজরে আনা হচ্ছে। আসনভিত্তিক অভিযোগগুলো তদন্ত কমিটিকে পাঠাচ্ছি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেন এসব ঘটনায় দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়, সেজন্য কমিশনও ত্বরিত ব্যবস্থা নিচ্ছে। প্রতিদিনই আমরা রিপোর্ট পাচ্ছি, মিনিমাম ৫০-৬০টি কেস রুজু হচ্ছে; কোথাও জরিমানা হচ্ছে; কোথাও শোকজ হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে বেশি সংঘাতের শঙ্কা করা হচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এসব আসনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হয়েছে। নির্বাচনকালে সহিংসতা, ভোটকেন্দ্র দখল করতে পারে এমন ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। সারা দেশে চলমান আছে অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও শান্তিপূর্ণ ভোট অনুষ্ঠান নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিবেশ শান্ত রাখতে তাদের সহযোগিতা চাওয়া হচ্ছে।আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, নির্বাচনের আগে ভোটার ও প্রার্থীদের মধ্যে যেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি না হয়, সেদিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সারা দেশে পুলিশ প্রস্তুত রয়েছে এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছে।নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সহনশীলতা ও প্রশাসনের কঠোর অবস্থান ছাড়া শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। সংঘর্ষ ও সহিংসতার খবরে সাধারণ ভোটারের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত না হলে ভোটকেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে দ্বিধায় পড়বেন তারা। ভোটারদের নিরাপত্তার বিষয়ে আশ্বস্ত করাই এখন সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মূল কাজ। এ জন্য সংঘর্ষ ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসে শৃঙ্খলার বিষয়ে তাদের সহযোগিতা নিতে হবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সামাজিক মাধ্যমে গুজব ও উসকানিমূলক তথ্য সহিংসতা বাড়াচ্ছে। একটি গুজবের ঘটনা আরও কয়েকটি সহিংসতায় ইন্ধন দিচ্ছে।বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নির্বাচন ঘিরে পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চলছে। এতে প্রতিপক্ষ প্রার্থীদের পাশাপাশি সরকারের মধ্যে থাকা কিছু ব্যক্তির ভূমিকা রয়েছে। দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, বিভিন্ন দিক থেকে উসকানি দেওয়া হচ্ছে। নতুন রাজনৈতিক দলগুলোর কিছু বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।জামায়াতে ইসলামী বলছে, নির্বাচনী প্রচারে প্রতিপক্ষের কর্মী-সমর্থকদের ওপর এ ধরনের হামলা নির্বাচন বানচালের গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, তারাই বিরোধী দল ও মতকে সহ্য করতে পারে না। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত না থাকায় সারা দেশে একটি দলের নেতাকর্মীরা জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য দলের প্রার্থী ও কর্মীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই যদি মা-বোন নিরাপদ না থাকেন, তবে তারা ক্ষমতায় গেলে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা থাকবে না।