বাজেটকে জনকল্যাণমুখী ব্যবসা সহায়ক দেখছে এফবিসিসিআইওসি মোয়াজ্জেমের গ্রেফতারে পুলিশের গাফিলতি নেইঅনলাইনে কেনাকাটায়ও ভ্যাটের খড়্গসীমান্তে প্রাণহানি 'অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু': বিএসএফ ডিজিঅনলাইন নিউজ পোর্টাল নিবন্ধনের তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর
No icon

ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জে এনবিআর

নতুন ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর আইন বাস্তবায়ন নিয়ে নানামুখী চ্যালেঞ্জে রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ভ্যাটের সর্বোচ্চ হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার ব্যাপারে অর্থমন্ত্রীর আগ্রহ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এনবিআরের। কেননা এতে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় কমবে। অন্যদিকে ট্যারিফ মূল্য প্রথা বিলুপ্ত হলে গুঁড়া মসলা, গুঁড়া দুধ, বিস্কুট-কেক-রুটির মতো নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে। আবার অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্যের তালিকায় এসব পণ্য অন্তর্ভুক্ত করা হলে ভ্যাট আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এছাড়া নতুন আইনের আওতায় সম্পূরক শুল্ক আরোপিত পণ্য সংখ্যা কমানো হবে, তখন স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষা কমবে। ফলে আমদানি নির্ভরতা বাড়বে। ব্যবসায়ীরাও সামগ্রিকভাবেই ভ্যাট আইন নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, ১ জুলাই থেকে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। ইসিআর (ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্ট্রার) মেশিনের পরিবর্তে খুচরা বিক্রেতাদের জন্য ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) আমদানির নিলাম কাজ চূড়ান্ত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ১০ হাজার ইএফডি মেশিন আনা হবে।

সেগুলো বিনামূল্যে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহ করা হবে। ১ জুলাই থেকেই এগুলো স্থাপনের কাজ শুরু হবে। অনলাইনে রিটার্ন জমার কাজও শেষ পর্যায়ে। ১ এপ্রিল প্রাথমিকভাবে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট রিটার্ন অনলাইনে জমা নেয়া হবে।

গত ১৪ মার্চ শেরেবাংলা নগরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমানে যেসব ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আছে, সেটিকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। ভ্যাটের হার হবে ৫, ৭ ও ১০ শতাংশ।

বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা বলেন, সর্বোচ্চ ভ্যাট হার কমানো হলে সিগারেট ও মোবাইল খাতের মতো বড় খাত থেকে রাজস্ব আদায় কমবে। আবার রেয়াত নেয়ার ব্যবস্থা না থাকলে স্থানীয় পর্যায়ে ১০ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করে সুফল পাওয়া যাবে না। কারণ বেশিরভাগ কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে।

সেই কাঁচামালের বিপরীতে রেয়াত না পেলে সামগ্রিকভাবে পণ্যের ওপর ভ্যাটের বোঝা বাড়বে। অন্যদিকে ট্যারিফ মূল্য বিলুপ্ত হলে স্থানীয় পর্যায়ে বেশকিছু পণ্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনা আছে। এখন সরকারের উচ্চ মহলের নির্দেশ অনুযায়ী বাজেটে ভ্যাটের হার নির্ধারণ করা হবে। বর্তমানে উৎপাদন পর্যায়ে ৮৫টি পণ্যে ট্যারিফ মূল্য বহাল আছে।

এর মধ্যে গুঁড়া দুধ, গুঁড়া মসলা, বিস্কুট, কেক, রুটি, আচার, টমেটো সস, ফলের জুস, এলপি গ্যাস, এলইডি লাইট, টিউব লাইট, চশমা, সানগ্লাস রয়েছে। নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন হলে এসব পণ্যের ট্যারিফ মূল্য থাকবে না। তখন প্রকৃত দামের ওপর উৎপাদকদের ভ্যাট দিতে হবে বিধায় এসব পণ্যের দাম বাড়বে।

উদাহরণস্বরূপ, এক কেজি হলুদ গুঁড়ার উৎপাদন খরচ ১০০ টাকা। বর্তমান নিয়মে এক কেজি হলুদ গুড়ার ট্যারিফ মূল্য ৪০ টাকা নির্ধারিত আছে। এই ৪০ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হচ্ছে, অর্থাৎ ৬ টাকা ভ্যাট দিতে হয়। নতুন ভ্যাট আইনের আওতায় ট্যারিফ মূল্য প্রথা বিলুপ্ত হলে ১০০ টাকার ওপরে ১৫ শতাংশ হারে অর্থাৎ ১৫ টাকা ভ্যাট দিতে হবে। তখন পণ্যের দাম বাড়বে।

অন্যদিকে ১৯৯১ সালের ভ্যাট আইনে আমদানি পর্যায়ে সর্বমোট ১ হাজার ৪৩১ ট্যারিফ লাইনের বিপরীতে বিভিন্ন হারে সম্পূরক শুল্ক আরোপিত ছিল। নতুন আইনে তা কমিয়ে ২৫৬টি ক্ষেত্রে সম্পূরক শুল্ক রাখা হয়েছে। এতে দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা কমবে। আমদানি পণ্যের কাছে মার খাবে দেশীয় পণ্য। এতে সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এসব বিষয় নিয়ে ব্যবসায়ীরাও উদ্বিগ্ন। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, ভ্যাট আইনে কী হচ্ছে, তা নিয়ে ব্যবসায়ীরা অন্ধকারে আছেন।

বহু তাগাদা দেয়ার পর গত বছরে মাত্র ২টি বৈঠক হয়েছে। ২ সপ্তাহ আগে আইনের বিভিন্ন ধারা খসড়া পাঠিয়ে মতামত চাওয়া হয়েছে। এখন বিভিন্ন চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে আলোচনা করে মতামত দেয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, ভ্যাট হার কমানো হবে নাকি একই থাকবে, সেটির চেয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে- আইন বাস্তবায়নের পর অর্থনীতিতে তার কী প্রভাব পড়বে। আমরা প্রভাব মূল্যায়ন করতে বলেছিলাম।

কিন্তু এনবিআর সেটি করেনি। এতে অনেক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যেমন স্টিল খাত। বর্তমানে স্টিল খাত ট্যারিফ মূল্যে ভ্যাট পরিশোধ করছে। এখন ট্যারিফ প্রথা বাতিল হলে প্রতি টন রডে ৩-৪ হাজার টাকা ভ্যাট দিতে হবে। এ ধরনের আরও অনেক বিষয় আছে। স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নানা নামে ডিউটি আরোপ করে থাকে।

কিন্তু নতুন আইনে ২শ'র কিছু বেশি পণ্যের সম্পূরক শুল্ক আরোপ করার কথা বলা হচ্ছে। এই ২০০ পণ্য কী কী, ব্যবসায়ীরা সেগুলো জানেন না। সামগ্রিকভাবে ব্যবসায়ীরা নতুন ভ্যাট আইন নিয়ে দুশ্চিতায় আছেন।