NEWSTV24
জরুরি মুহূর্তে মিলছে না আইসিইউ, বাড়ছে মৃত্যু
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ১০:১৪ পূর্বাহ্ন
NEWSTV24

NEWSTV24

ফটিকছড়ি পৌর এলাকার ৩৬ বছর বয়সী মো. খোরশেদুল আলমের শরীরে হঠাৎ দেখা দেয় তীব্র জ্বর। এক দিনের ব্যবধানে শুরু হয় শ্বাসকষ্ট। তিন দিনেও জ্বর না কমায় পরীক্ষা করলে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। গত শুক্রবার তাঁকে ভর্তি করা হয় চট্টগ্রাম নগরীর সিএসসিআর হাসপাতালে। তবে দ্রুত প্লাটিলেট কমে যায়। ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) স্থানান্তর করার কথা পরিবারের সদস্যদের জানান চিকিৎসকরা। সরকারি-বেসরকারি কয়েকটি হাসপাতালে খুঁজে অনেক সময় পার হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত একটি শয্যা পাওয়া গেলেও ততক্ষণে তাঁর অবস্থা জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। আইসিইউতে ভর্তি করাতে নিয়ে যাওয়ার পথেই গত শনিবার মারা যান খোরশেদুল। চিকিৎসকরা পরিবারকে জানান, জরুরি মুহূর্তে আইসিইউ সাপোর্ট না পাওয়ায় তাঁর শারীরিক অবস্থা জটিল পর্যায়ে চলে গিয়েছিল।এমন করুন পরিণতি কেবল খোরশেদুল আলমের নয়, জরুরি মুহূর্তে আইসিইউ না পেয়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত আরও অনেকের গেছে প্রাণ।চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, ১৫টি উপজেলা ও সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ৪১টি ওয়ার্ডে প্রতিনিয়ত বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী। গত মঙ্গলবার ডেঙ্গু আক্রান্ত ১০৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, মৃত্যু হয়েছে দুজনের। গতকাল বুধবার দুজনের মৃত্যু হয়েছে, আক্রান্ত হয়েছেন ৯৮ জন। চলতি মাসের প্রথম ১৪ দিনে আক্রান্ত প্রায় এক হাজার ৩০০ জন, মৃত্যু হয়েছে সাতজনের। প্রতিদিন ৯০ থেকে ১০০ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে। তাদের মধ্যে ২০ থেকে ৩০ জনের শারীরিক অবস্থা দ্রুত খারাপ হয়। তাদের বাঁচাতে প্রয়োজন হয় আইসিইউ। হন্যে হয়ে খুঁজেও তা পাচ্ছেন না রোগীর স্বজন। চলতি বছর পাঁচ হাজার ৭৫৪ জন আক্রান্ত হয়েছে, মৃত্যু হয়েছে ২৮ জনের।

সরকারিভাবে কেবল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ৬০টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। এসব শয্যায় হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগের মুমূর্ষু রোগীরা ভর্তি থাকেন। কেবল কোনো রোগী স্থানান্তর করলে বা কারও মৃত্যু হলে আরেকজন মুমূর্ষু রোগীর কপালে জুটে আইসিইউ শয্যা।চট্টগ্রাম নগরীর বেশ কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে কিছু সংখ্যক আইসিইউ শয্যা থাকলেও শুধু শয্যা বাবদ প্রতিদিন রোগীকে গুণতে হয় ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। তাই ডেঙ্গু রোগীর বেশির ভাগই শয্যার আশায় ছুটে যান চমেক হাসপাতালে।জরুরি মুহূর্তে আইসিইউ শয্যা না পেয়ে গত শনিবার মারা গেছে পাঁচ বছরের আনিশা নাথ। চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর ১ নম্বর শেড হিন্দুপাড়ার বাসিন্দা মিথুন নাথের একমাত্র মেয়ে আনিশা। শয্যা না পাওয়ায় প্রাণ দিতে হয়েছে সাত বছরের শিশু অনুশ্রী দাশকেও।ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া খোরশেদুল আলমের (৩৬) বড় ভাই তৌহিদুল আলম বলেন, গত শুক্রবার সকালে খুরশেদুলকে সিএসসিআর হাসপাতালে ভর্তি করার এক ঘণ্টার মধ্যে অবস্থার অবনতি ঘটে। ডাক্তাররা জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউ লাগবে বলে জানান। তখন ওই হাসপাতালে শয্যা খালি ছিল না। স্বজন, বন্ধুবান্ধবসহ অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করি আইসিইউ শয্যার জন্য। পরে এক ঘনিষ্ঠজন আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালে একটি শয্যার ব্যবস্থা করেন। সেখানে যাওয়ার পথেই মারা যান খোরশেদুল।

আনিশা নাথের বাবা মিথুন নাথ বলেন, গত ৬ অক্টোবর আনিশার জ্বর আসে। গত শুক্রবার মধ্যরাত থেকে ছটফট করতে থাকে সে। শিশু হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তাররা বলেন, আইসিইউতে নিতে হবে। তখন একটি শয্যাও খালি ছিল না। পরে পুরো এক দিন অনেকজনকে ফোন করি একটি শয্যার জন্য। অনেক চেষ্টায় একটি শয্যার ব্যবস্থা হয়। সেখানে ভর্তির তিন ঘণ্টার মধ্যে শনিবার সকালে মৃত্যু হয় তার। আগে শয্যা পাওয়া গেলে হয়তো আমার মেয়েকে বাঁচানো যেত।চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম আজাদ বলেন, শিশু ও বয়স্ক মিলে ৭০টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। প্রতিদিন শয্যা চেয়ে ফোন করেন অনেকে। গত কয়েক দিন ধরে রোগীর এতবেশি চাপ যে, এক মুহূর্তের জন্য একটি শয্যাও খালি থাকছে না।চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত অনেকের আইসিইউর প্রয়োজন হচ্ছে। তবে শয্যা সংকটের কারণে সেটি জরুরি মুহূর্তে মিলছে না। আক্রান্তের হার কমাতে মশা মারার বিকল্প নেই। তা না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে বলে দাবি করেছেন চট্টগ্রামের সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, হটস্পটগুলোতে মশক নিধন, লার্ভা ধ্বংস, ওষুধ প্রয়োগ ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।