NEWSTV24
ঝুঁকিপূর্ণ ২৬টি বিদ্যালয় ভবনে চলছে পাঠদান
শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:০৪ পূর্বাহ্ন
NEWSTV24

NEWSTV24

১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার হাবিবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এখানে ১৯৯৩ সালে নির্মাণ করা হয় একতলা ভবন। ২০১৮ সালে উপজেলা প্রকৌশল বিভাগ সেই ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। তবুও ঝুঁকি নিয়ে তিন কক্ষের এই ভবনে চলছে ২১৮ জন শিক্ষার্থীর ক্লাস। তাদের জন্য রয়েছে মাত্র ১৭ সেট বেঞ্চ। ভবন নির্মাণের সময় দেওয়া ৩৯ সেট বেঞ্চের মধ্যে ২২ সেট নষ্ট হয়ে গেছে। সম্প্রতি ক্লাস নেওয়ার সময় এক সহকারী শিক্ষিকার শরীরে খুলে পড়েছিল ছাদের রডসহ ফ্যান। এসব কারণে বিদ্যালয়টি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছে আতঙ্কের জায়গায় পরিণত হয়েছে।একই চিত্র উপজেলার ২৬টি বিদ্যালয় ভবনের। এসব ভবনের অধিকাংশই পাঁচ থেকে ১০ বছর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, চারঘাটে ৭৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ২৬টি বিদ্যালয়ের ভবনে শ্রেণিকক্ষের সংকট রয়েছে। অন্যদিকে ৪৫টিতেই বর্তমানে প্রধান শিক্ষক নেই। সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিয়ে এসব বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে।

হাবিবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সাইফুর রহমানের ভাষ্য, বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেও প্রতিকার পাননি। ১৯৯৪ সালের পর নতুন বেঞ্চও পাওয়া যায়নি। শিক্ষার্থীরা ভাঙা ভবনে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে ক্লাস করছে। এ কারণে তাদের বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে।বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষিত বিদ্যালয় ভবনেই পাঠদান চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এরই মধ্যে কোনো কোনো বিদ্যালয়ে ফ্যান খুলে পড়েছে। কোনো ভবনের ছাদের বিভিন্ন অংশ পড়ছে খসে। সম্প্রতি বিদ্যালয়গুলো ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। দেখা গেছে, কোথাও নতুন ভবন নির্মাণ হলেও সেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। আবার যে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দুই শতাধিক, সেখানে শ্রেণিকক্ষ রয়েছে মাত্র তিনটি। ভবনের অবস্থাও জরাজীর্ণ। এতে একদিকে নতুন ভবনের যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না, অন্যদিকে শিক্ষার্থীর চাপ থাকা বিদ্যালয়গুলোতে শ্রেণিকক্ষ সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। নতুন ভবন বরাদ্দের অব্যবস্থাপনার কারণে এ অবস্থা তৈরি হয়েছে।

উপজেলার ধর্মহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দুই শতাধিক। তাদের জন্য শ্রেণিকক্ষ রয়েছে মাত্র তিনটি। যে ভবনে এসব শ্রেণিকক্ষ সেটি ১০ বছর আগে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। দেখা যায়, ভবনের ছাদে ফাটল ধরেছে, মেঝেতে উইপোকা মাটি তুলে বাসা বেঁধেছে। এর মধ্যেই ঝুঁকি নিয়ে চলছে পাঠদান। বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বজলুর রশীদ বলেন, শ্রেণিকক্ষের পাশাপাশি শৌচাগারও ঝুঁকিপূর্ণ। দুই শতাধিক শিক্ষার্থী ভাঙা তিনটা শ্রেণিকক্ষে গাদাগাদি করে ক্লাস করছে। মাঝেমধ্যে ছাদের ঢালাইয়ের অংশ খসে পড়ছে।একই চিত্র দেখা গেছে খোর্দগোবিন্দপুর, ভাটপাড়া, ইউসুফপুর, মেরামতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ মোট ২৬টি বিদ্যালয়ে। খোর্দগোবিন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক মোহাম্মদ রায়হান বলেন, রামচন্দ্রপুর, ঝাউবোনাসহ কয়েকটি বিদ্যালয়ে ভবন দেওয়া হয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১০০ জনেরও কম। নতুন ভবন ব্যবহারই হয় না ঠিকমতো। কিন্তু আমাদের এ বিদ্যালয়ে ভবন দেবে গেছে। মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনা ঘটছে। ৪৫ বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধানউপজেলার মোট ৪৫টি বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন সহকারী শিক্ষকরা। তাদের প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি নিয়মিত পাঠদানও করতে হচ্ছে। এতে সার্বিক কার্যক্রম তদারকিতে চাপ তৈরি হচ্ছে।

নন্দনগাছী এলাকার খাইরুল ইসলামের ভাষ্য, তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারের অনেকেই সন্তানদের কিন্ডারগার্টেনসহ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাচ্ছেন। ফলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মূলত নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। বিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও প্রধান শিক্ষকের মতো ব্যবস্থাপনা সংকট তাদের শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।উপজেলা প্রধান শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. মখলেসুর রহমান বলেন, ৪৫টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। সহকারী শিক্ষকরা সেখানে রুটিন দায়িত্ব পালন করছেন। মামলাসহ নানা কারণে এ পদগুলো খালি ছিল। দ্রুতই প্রধান শিক্ষকের পদায়ন হবে বলে তারা আশ্বাস পেয়েছেন।সাবেক শিক্ষক ও উপজেলা নাগরিক কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বাদশা বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা একটি শিশুর শিক্ষাজীবনের ভিত্তি তৈরি করে। এ পর্যায়ে নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ, পর্যাপ্ত শিক্ষক, কার্যকর বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা জরুরি। এসব সংকট পরিকল্পনার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয় বলেও মনে করেন তিনি। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোছা. ফাতেমা খাতুন বলেন, এসব সংকটে পড়াশোনার ওপর কিছুটা প্রভাব পড়ছে। ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয় ভবন অপসারণ ও নতুন ভবন নির্মাণে চাহিদা পাঠানো হয়েছে। প্রধান শিক্ষক নিয়োগের কাজ চলছে।