NEWSTV24
জ্বালানি তেল পরিশোধনের ক্ষমতা বাড়ছে তিনগুণ
শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:৪৪ পূর্বাহ্ন
NEWSTV24

NEWSTV24

উদ্যোগ নেওয়ার প্রায় ১৬ বছর পর ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড-২ (ইআরএল-২) প্রকল্পটি অবশেষে আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে দাতা সংস্থার সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষর বাংলাদেশের। বর্তমানে ইআরএলের বার্ষিক পরিশোধনক্ষমতা প্রায় ১৫ লাখ টন। দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে এই সক্ষমতা বেড়ে ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হবে। এর ফলে জ্বালানি নিরাপত্তায় দেশ অনেকটা এগিয়ে যাবে।জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে দীর্ঘ ১৬ বছরে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধন হয়েছে ১১ বার। এতে ইআরএলের দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। সর্বশেষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ২০২৫ সালে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটি সর্বশেষ অনুমোদিত হিসাবে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১৩৮ শতাংশ। এবার প্রকল্পের অর্থায়নে যুক্ত হচ্ছে বিদেশি ঋণ।

দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইআরএলের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইডিবি) সঙ্গে গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সরকারের প্রায় ১২ হাজার ২৫২ কোটি টাকার অর্থায়ন চুক্তি হয়েছে। ইআরএল-২ প্রকল্পের মোট ব্যয় দুই দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার, বা প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসাবে প্রায় ৩০ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার বা ১২ হাজার ২০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হচ্ছে। বাকি অর্থ সরকার ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়ার কথা।এ বিষয়ে ইআরএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. শরীফ হাসনাত  বলেন, জ্বালানি তেল পরিশোধনের ইআরএল দ্বিতীয় ইউনিট প্রকল্পটি দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতোমধ্যে প্রকল্পটির জন্য আইডিবির সঙ্গে ঋণচুক্তি হয়েছে। মোট দুই দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলারের এ প্রকল্পে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়া হচ্ছে। বাকি অর্থ সরকার ও বিপিসি নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে জ্বালানি তেল পরিশোধন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় দেশ অনেকটা এগিয়ে যাবে।গতকাল সচিবালয়ে মডার্নাইজেশন অ্যান্ড এক্সপানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি ইন বাংলাদেশ প্রকল্পের এ চুক্তি স্বাক্ষর হয়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান এবং আইডিবির ডিরেক্টর জেনারেল আনাসে আইসামি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং আইডিবি গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আল জাসের উপস্থিত ছিলেন।

১৩ হাজার থেকে ৩১ হাজার কোটি : ইআরএলের দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১০ সালে। ইনস্টলেশন অব ইআরএল-২ নামে প্রকল্পটি ২০১৩ সালে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু অনুমোদনের পরও কাজ শুরু হয়নি। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের ডিপিপি একের পর এক সংশোধন করা হয়। গত ১৬ বছরে ডিপিপি সংশোধন হয়েছে ১১ বার। এতে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। অর্থাৎ প্রাথমিক অনুমোদনের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা বা ১৩৮ শতাংশ।

বদলেছে অর্থায়নের পথ : ইআরএল-২ বাস্তবায়নে একাধিকবার অর্থায়নের পথ পরিবর্তন হয়েছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের শুরুতে তৎকালীন সরকারের ঘনিষ্ঠ শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ ইআরএলের নিজস্ব জমিতে বড় একটি রিফাইনারি নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছিল। সরকারের সঙ্গে এস আলম গ্রুপের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায় থাকলেও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই উদ্যোগ বাতিল হয়ে যায়। এরপর সরকার নিজস্ব অর্থায়নে ইআরএল-২ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। গত ২৩ ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। তখন ৩১ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে সরকারি কোষাগার থেকে ১৮ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা এবং বিপিসির নিজস্ব তহবিল থেকে ১২ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়। এখন আইডিবির ঋণ যুক্ত হওয়ায় প্রকল্পের অর্থায়ন কাঠামো আবার পরিবর্তিত হচ্ছে।

১২ হাজার কোটি টাকার বেশি আইডিবি ঋণ : ইআরএল সম্প্রসারণ প্রকল্পে অর্থায়নের সম্ভাবনা যাচাই করতে গত মার্চে আইডিবির একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে। তারা জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং ইআরএলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে। পাশাপাশি চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে। আইডিবির চাহিদা অনুযায়ী প্রকল্পের সমীক্ষা প্রতিবেদন, ডিপিপি, সরকারি ক্রয়কৌশল পরিকল্পনা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত তথ্য দেওয়া হয়। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা এগোয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আইডিবির কোনো একক প্রকল্পে এটিই সর্বোচ্চ অর্থায়ন। সহজ শর্তে অর্থায়নের মাধ্যমে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে সহযোগিতা করবে আইডিবি।

তিন গুণ বাড়বে শোধনক্ষমতা : ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় প্রতিষ্ঠিত হয় ইআরএল। দেশের জ্বালানি তেলের চাহিদা কয়েক দশকে কয়েক গুণ বাড়লেও প্রায় ছয় দশকে রিফাইনারিটির সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। বর্তমানে ইআরএলের বার্ষিক পরিশোধনক্ষমতা প্রায় ১৫ লাখ টন। দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণ হলে তা বেড়ে ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হবে। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে পেট্রোলিয়াম পণ্যের ব্যবহার ছিল প্রায় ৬৭ লাখ ৩০ হাজার টন। ওই বছর ইআরএল পরিশোধন করেছে প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার টন। ফলে ৫০ লাখ টনের বেশি পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করতে হয়েছে।প্রকল্পে ইউরোপের মানের পেট্রল ও ডিজেল উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে ফার্নেস অয়েল, এলপিজি, লুব বেজ অয়েল ও জেট ফুয়েল উৎপাদনের সক্ষমতাও বাড়বে। বিপিসির হিসাবে, নতুন ইউনিটে বছরে প্রায় ৪ লাখ টন ফার্নেস অয়েল, ৬০ হাজার টন এলপিজি, ৬ লাখ টন পেট্রল, ১১ লাখ টন ডিজেল, ২ লাখ টন লুব বেজ অয়েল এবং প্রায় ৫ লাখ টন জেট ফুয়েল উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হবে।

এসপিএমের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগবে : ইআরএল-২ বাস্তবায়নের সঙ্গে সাগরে নির্মিত সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং বা এসপিএম প্রকল্পেরও সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বড় জাহাজ থেকে পাইপলাইনে সরাসরি অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল খালাস করা যায়। এসপিএমে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেলের জন্য পৃথক পাইপলাইন রয়েছে। তবে ইআরএলের দ্বিতীয় ইউনিট চালু না হলে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের পাইপলাইনের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো সম্ভব হবে না। ফলে ইআরএল-২ চালু হলে রিফাইনারির সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি এসপিএমে করা বড় বিনিয়োগের সুফলও পুরোপুরি পাওয়া যাবে।

প্রকল্পে পিডি নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন : এদিকে প্রকল্পের বাস্তবায়ন পরিচালক (পিডি) নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত বুধবার জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব আছমা আরা বেগমকে ইআরএল-২ প্রকল্পের পিডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকার জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পে খাতসংশ্লিষ্ট কারিগরি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থাকা কর্মকর্তাকে না দিয়ে একজন মধ্যমসারির আমলাকে পিডি নিয়োগ দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিপিসি ও ইআরএলের কর্মকর্তারা।