শ্রমিকের মজুরি দয়া নয়, এটি ন্যায্য হিস্যা ও নাগরিক অধিকার, মজুরি শুধু শ্রমিকদের বিষয় নয়, এটি একই সঙ্গে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যু। মজুরি সমস্যার ফয়সালা না হলে শিল্প পরিচালনা, জাতীয় অর্থনীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হবে বলে গোলটেবিল বৈঠকে মন্তব্য করেন প্রধান অতিথি সুলতান উদ্দিন আহমদ।
গতকাল ২৭ আগস্ট বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের উদ্যোগে অবিলম্বে জাতীয় নিম্নতম মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের দাবিতে গোল টেবিলে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে
প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান ও বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ এবং
সভাপতিত্ব করেন, ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান। কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লসর মোঃ তসলিমের সঞ্চালনায় গোলটেবিলে বক্তব্য রাখেন ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সিনিয়র সহ-সভাপতি অধ্যাপক হারুনুর রশিদ খাঁন, গোলাম রব্বানী, বাংলাদেশ লেবার ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শাকিল আক্তার চৌধুরী, বাংলাদেশ গার্মেন্টসএন্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আক্তার, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সহ-সাধারণ সম্পাদক রোজিনা আক্তার,
বাংলাদেশ লেবার কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক নাজমা আক্তার,সম্মিলিত শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন, খেলাফত শ্রমিক মজলিস সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন মিয়াজি,
সবুজ বাংলা গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন সভাপতি ইসমাইল হোসেন ঠান্ডু, বাংলাদেশ প্রগতিশীল নির্মাণ শ্রমিক ফেডারেশন সভাপতি নুরুল আমিন , গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশন যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক সোহেল রানা মিঠু, শ্রমিক মজলিস সভাপতি আব্দুল করিম, দর্জি শ্রমিক ফেডারেশন সভাপতি অ্যাডভোকেট আলমগীর হোসাইন, বিটিসিএল শ্রমিক কর্মচারি ফেডারেল ইউনিয়ন সভাপতি নজরুল ইসলাম,
বাংলাদেশ প্রগতিশীল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সহ-সভাপতি শাহিদা সরকার,
জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোটের সভাপতি মাহতাব উদ্দিন শহীদ,
বাংলাদেশ সংযুক্ত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন সভাপতি ফেরদৌসী বেগম,
ডিপিডিসির শ্রমিক কর্মচারী কল্যাণ পরিষদ সভাপতি আ,ন,ম বজলুর রহমান,
সহ বিভিন্ন শ্রমিক সেক্টরের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথি সুলতান উদ্দিন আহমদ
তিনি বলেন, “একটি জাতির মজুরি কত হবে—এটি জাতীয়ভাবে নির্ধারণের বিষয়। ক্যান্টিন কমিটি, ইসি কমিটিসহ বিভিন্ন কমিটি করার সুযোগ থাকলেও শুধু শ্রমিকদের মজুরি দমিয়ে রাখার জন্য অনেক সেক্টরে ইউনিয়ন করতে দেওয়া হয় না। এটি একটি কেন্দ্রীয় সমস্যা।”
তিনি আরও বলেন, মজুরি নির্ধারণে কোনো মনগড়া ভিত্তি গ্রহণ করা যাবে না। জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নীতি, খাত ভিত্তিক মজুরি এবং পেশাভিত্তিক মজুরি—এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে একটি জাতীয় মজুরি কাঠামোর ভিত্তি তৈরি করা জরুরি। শ্রমিকের মজুরি কোনো দয়া বা অনুকম্পা নয়; এটি তার ন্যায্য হিস্যা ও নাগরিক অধিকার।
সুলতান উদ্দিন আহমদ বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা, টেকসই উন্নয়ন ও জীবনযাত্রার ব্যয়সহ সামগ্রিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। শুধু ‘মিনিমাম ওয়েজ’ বা ন্যূনতম মজুরির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বর্তমানে ‘লিভিং ওয়েজ’ নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, মজুরি নির্ধারণের পদ্ধতিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মজুরি বোর্ডকে নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে কাজ করতে হবে। শ্রমিকদের পক্ষ থেকে যারা প্রতিনিধিত্ব করবেন, তাদেরও শ্রমিকের স্বার্থে কার্যকরভাবে কথা বলার সক্ষমতা ও ন্যূনতম যোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় শ্রমিকরা বারবার প্রতারিত হবে।
সভাপতির বক্তব্যে অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, দেশের শ্রমিকদের পক্ষে কথা বলা আমাদের দায়িত্ব। শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবি সরকার মানতে অস্বীকার করলে শ্রমিকরা মাঠে আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবে।
তিনি বলেন, ২০২৩ সালে গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের পর গাজীপুরে শ্রমিকদের বিক্ষোভে চারজন শ্রমিক নিহত হন। ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশে শ্রমিকদের জন্য আর কোনো ‘ম্যানেজ মজুরি’ মেনে নেওয়া হবে না। জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করতে হবে এবং অবিলম্বে জাতীয় মজুরি বোর্ড গঠন করে সব খাতের শ্রমিকদের জন্য যৌক্তিক মজুরি নিশ্চিত করতে হবে।
অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, “২০২৩ সালে শ্রমিকেরা ঠকেছে, এবার আর ঠকতে দেওয়া হবে না। শ্রমিকের অধিকার আদায় করেই ছাড়ব, ইনশাআল্লাহ।”
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের ছয় মাস অতিক্রান্ত হলেও শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ও জীবনমান উন্নয়নের বিষয়ে এখনো কোনো সুস্পষ্ট ও যৌক্তিক উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। শিক্ষা, চিকিৎসা, জীবনযাত্রার মান এবং বাজারমূল্য বিবেচনায় নিয়ে একটি কার্যকর মজুরি কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে। কোনো ধরনের থোক বরাদ্দ বা অনুকম্পার মাধ্যমে শ্রমিকের অধিকার পূরণ করা যাবে না।
তিনি আরও বলেন, দেশের শিল্প-কারখানা বাড়লেও শ্রমিকের মজুরি সে অনুযায়ী বাড়ছে না। শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার আদায়ে তারা ঐক্যবদ্ধ। প্রয়োজনে শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ঝুঁকি নিতেও তারা প্রস্তুত।
চা শ্রমিকদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরির দাবিতে তারা আন্দোলন করছেন। তাদের যৌক্তিক দাবি মেনে নিয়ে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরি নির্ধারণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে দেড় হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং বিভিন্ন পেশার বহু শ্রমিকও এতে শহীদ হয়েছেন। ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ দেশের বিভিন্ন গণআন্দোলনে শ্রমিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও বরাবরই তাদের স্বার্থ উপেক্ষিত হয়েছে।
বার্তা প্রেরক
আতাউর রহমান
সিনিয়র রিপোর্টার