NEWSTV24
উঁচু পাহাড়ের ভাঁজ বেয়ে বান্দরবানের নীলাচলে এক বিকেলে
বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ০০:৫৬ পূর্বাহ্ন
NEWSTV24

NEWSTV24

বান্দরবান থেকে ফিরে :  দুপুরের পর অফিসে নিউজ পাঠিয়ে দ্রুতই আমরা হৈ চৈ করে নির্ধারিত গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পরি। বিকেল বেলাকে উপভোগ করতে শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে নীলাচলকে বেছে নেই। হালকা বিশ্রাম নিয়ে দ্রুতই আমরা দল বেধে নীলাচলে যাই।

উঁচু পাহাড়ের ভাঁজ বেয়ে বেয়ে আমাদের গাড়ি উঠে যায় নীলাচল নামের পাহাড়ের চুড়ায়। শত পাহাড় পেরিয়ে সেখানে পৌঁছে দেখি সৃষ্টিকর্তার অপরূপ সৃষ্টি নানা রঙের রূপ বৈচিত্র আর নানা রকমের আবহাওয়ার অনুভূতি বিলাতে দাঁড়িয়ে আছে নীলাচল। আমাদের পাশাপাশি আরও অনেক মানুষ দল বেঁধে আসছে উপভোগ করছে নীলাচলের রূপবৈচিত্র আর আবহাওয়া। আমরা যখন নীলাচলের চুড়ায় পৌঁছাই তখন শেষ বিকেল সমাগত। সূর্য্য মামার বিদায় নেওয়ার পালা। সেখানে নেমেই সবাই যার যার মতো করে ছবি তুলছে। আমরাও বাদ গেলাম না। নীলাচল সাধারণত হাত বাড়ালেই মেঘের পরশ পাওয়ার জন্য খ্যাত। আমরা মেঘের পরিবর্তে কুয়াশার পরশ পেলাম। কুয়াশার শুভ্র সফেদ আবরণ দিয়ে চারদিক আবৃত করে রেখেছে। আমরা কিছুটা পড়ন্ত বিকেলে সেখানে যাওয়ার কারণে সূর্য ডোবার দৃশ্যটা চমৎকার ভাবে দেখতে পাই। সূর্য্য মামার বিদায়কে অন্তর দিয়ে ধারণ করি। 

পর্যটকরা সাধারণত নীলাচলে নেমেই পাহাড়ের ঢালে জন্মানো খাবারে স্বাদ নেওয়ার চেষ্টা করে। এই সময়টাতে পাহাড়ি পেপে, বড়ুই, আর আনারসটা বেশি পাওয়া যায়। আমরাও প্রথমে পেপে কিনে খেলাম। এরপর প্রকৃতির সান্নিধ্যে গেলাম। তবে আমার একটু বাড়তি আগ্রহ ছিল সেখানকার বাসিন্দাদের জীবনাচার নিয়ে কথা বলা এবং তাদের জীবনবোধ সম্পর্কে জানা।

নীলাচলে পাহাড়ের শেষ চূড়ায় কয়েকটি দোকান রয়েছে; যেখানে উপজাতি নারীরা কাপড়ের পসরা নিয়ে বসে আছে। আমি এক দোকানে প্রবেশ করে এক তরণীর সাথে কথা বলা শুরু করি। দেখি তার কথাবার্তা বেশ গোছালো। এবং পড়াশোনা করছে। আমার কথাগুলোর উত্তর দিচ্ছে বিব্রতবোধ ছাড়াই।

একেবারেই হালকা গড়নের চেহারা। বার বার পাহাড়ে উঠা নামা করার কারণে শরীর এমন ছিপছিপে বলে জানা গেলো। কিছুক্ষণ কথা বলার পর তার দোকানে আমার মেয়ের জন্য একটি কামিছ দর দাম করলাম। যা হউক, আমি পছন্দ করা জামা কিছুটা বড় হয়ে যাবে এমন যুক্তি দেখালে মেয়েটা এই বলে বোঝানোর চেষ্টা করে যে কিছুটা বড় হলে ছোট করা যাবে। কিন্তু ছোট হলেতো জামাটা পড়তেই পারবে না। তবে তার নিয়ত যে কোন উপায়ে এক দামেই বিক্রি করবে আমার কাছে। আমি কিছুটা নাছোড় বান্দা কিছু দাম কমাবোই। কিন্তু মেয়েটি কোনভাবেই দাম কমাবে না। আমি ইচ্ছে করেই আরেক দোকানে গেলাম। সেখানেও এক ভার্সিটি পড়ুয়া মেয়ে দোকানের বিক্রেতা। আমি কিছুটা দুষ্টুমি করে বললাম হাউ মাচ প্রাইজ। দেখলাম মেয়েটা চমৎকার ইংরেজি বলতে পারে। সেও একইভাবে একদাম বলে বসে থাকলো। আমি যখন আরেক দোকানে গিয়ে জামার দাম করতে চ্ইালাম তখন ওই মহিলা জামা হাতে নেওয়ার পরই বলে দিলো দামাদামি করলে লাভ হবে না। একদামেই কিনতে হবে। আমি বুঝলাম আগের দোকানে যে আমি দামাদামি করেছি তা তিনি শুনেছেন। উপায় না পেয়ে প্রথম দোকানির কাছ থেকেই মেয়ের জন্য জামা এবং মেয়ের মায়ের জন্য হাতে বোনা চাদর কিনলাম। দেখলাম নীলাচলে প্রতিটি জিনিসের দাম বেশি। ঢাকায় যে ডাবের দাম একশ’ টাকা; নীলাচলে সেই ডাবের দাম দেড়শ’ টাকা। স্থানীয় ফল আনারস, পেপেসহ সব কিছুই বেশি দামে এবং এক দামে বিক্রি করেন। এরপরও মানুষ দলে দলে কিনে খাচ্ছে এসব জিনিস দুষণমুক্ত বলে। আমরা পেপে খাওয়ার পর এককাপ চা পান করলাম।

মজার বিষয় হলো সব দোকানি-ই বিনয়ের সাথে আমাকে জানালো তাদের সব দোকানেই ফিক্সড প্রাইজে কাপড় বিক্রি হয়। তবে প্রথম যার সাথে কথা বলেছিলাম সেই তরুণী আমার কাছ থেকে ৫০ টাকা কম নিবে বলে জানিয়েছিল। আমি আর তিনটি দোকান যাচাই করে দেখি ওর কথাই ঠিক। এরপর আমি সেই জামা কিনে নেই।

এরপর এদিক সেদিক ঘুরে নিচে তাকিয়ে দেখলাম পাহাড়ের নিচে থাকা গ্রামগুলো কুয়াশায় মোড়ানো। অন্য সময়টাতে সাধারণত মেঘ মোড়ানো থাকলেও আমরা দেখলাম ভিন্ন চিত্র। পাহাড়ের নিচে বসবাসকারীদেরকে পাড়া বলা হয়। এসব পাড়ায় বাড়ি তৈরি করে বসবাস করে উপজাতিরা। কোন কোন পাড়ায় বাঙালিরাও বসবাস করে। রয়েছে মসজিদও। মাগরিবের সময় মাইকে আজানের ধ্বনি শুনতে পেয়ে জিজ্ঞেস করে জানতে পারি সেখানে বাঙ্গালিরাও বসবাস করে।

ততক্ষণে মাগরিবের নামাজের আজান হয়ে গেছে। পাহাড়ের চূড়ায় মসজিদেও মাইকে আজানের আওয়াজ শুনে ভাল লাগলো। দোকানিদের জিজ্ঞেস করলাম মাইকে আজান শোনা যায়। এখানে কি মসজিদ আছে ? মহিলা দোকানি মাথা নেড়ে সাই দিয়ে জানালো হ্যাঁ আছে। এখানে মুসলমান ও আছে মসজিদও আছে। আমার ইচ্ছে করলো--। কিন্তু সন্ধ্যা হওয়ায় মসজিদে যাওয়ার সাহস পেলাম না। সাথের সবাই নিরুৎসাহিত করলেন। এই সন্ধ্যায় যাওয়া ঠিক হবে না। সূর্যাস্তের পর আমরা দ্রুত গাড়িতে উঠি এবং হোটেলে ফিরে আসি। (চলবে)