মালিবাগে পুলিশের গাড়িতে হামলার ‘দায়’ নিল আইএসসেই নিখিলের সঙ্গে নুসরাতের বিয়ে?লাখো মুসল্লির জন্য প্রস্তুত হচ্ছে জাতীয় ঈদগাহমধ্যরাতে ফের রাজু ভাস্কর্যে ছাত্রলীগের পদবঞ্চিতদের অবস্থানশাশুড়ির সঙ্গে ঝগড়া, দুই সন্তানকে হত্যার পর আত্মহত্যা
No icon

ইরানের সঙ্গে সংঘাত হবে ইরাক যুদ্ধের চেয়েও ভয়ঙ্কর

ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উদ্বেগজনকভাবে সংঘাতের খুব কাছাকাছি চলে গেছে। সম্ভাব্য ইরানি হুমকি মোকাবেলায় দেশটিকে প্রতিরোধে মাধ্যপ্রাচ্যে রণতরী ও বোমারু বিমান পাঠানোর কয়েকদিন পর চলতি সপ্তাহের শেষে দুটি সৌদি তেল ট্যাংকার ও একটি নরওয়েজিয়ান জাহাজ পারস্য উপসাগরে নাশকতামূলক হামলার শিকার হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধাবাজ রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট এবং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত মধ্যপ্রাচ্যের একটি বৈরী দেশের মধ্যে দ্বন্দ্ব ২০০৩ সালের ইরাক আগ্রাসনের আগের বহু পর্যবেক্ষককে মনে করিয়ে দিচ্ছে, এতে জড়িত সবার জন্যই ওই যুদ্ধ মারাত্মক বিপর্যয় বয়ে এনেছিল। ফিরে আসা সেই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির নতুন রূপের কিছু চরিত্র সম্পূর্ণভাবে একই। যেমন, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ক একজন আন্ডারসেক্রেটারি হিসেবে সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের আমলে ইরাক আগ্রাসনের পরিস্থিতি তৈরি করার জন্য দায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বল্টন তাদের একজন।

সেই সময়ের নিজের ভূমিকার জন্য বল্টন ‘অপরিণামদর্শী’ হিসেবে খেতাব পেয়েছিলেন। তার নাম উল্লেখ না করেই ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ সাংবাদিকদের বলেন, মার্কিন প্রশাসনের ভেতর উগ্রপন্থীরা অমূলকভাবে পারস্য উপসাগরে ঘটনাবলীর জন্য ইরানের ওপর দায় চাপাতে চেষ্টা করছে।

নানাভাবে মিল থাকা সত্ত্বেও ইরানের সঙ্গে সংঘাত কখনোই ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের অবস্থা ফিরিয়ে আনবে না। বিভিন্ন দিক বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে, এ সংঘাত সম্পূর্ণ আলাদা ফল বয়ে আনবে। নিঃসন্দেহে এটা হবে ইরাক যুদ্ধের চেয়েও বিপর্যয়কর ও ধ্বংসাত্মক। ২০০৩ সালের ইরাকের তুলনায় বর্তমান সময়ের ইরান তাৎপর্যপূর্ণভাবে ভিন্ন একটি দেশ। কাজেই যুদ্ধটাও হবে ভিন্ন কৌশলের।

যদি তা নাও হয়, তবুও ২০০৩ সালের আগ্রাসনের আগের ইরাকে চেয়ে ইরান একটি বিশাল-বিস্তৃত দেশ। তখন ইরাকের জনসংখ্যা ছিল আড়াই কোটি, আর বর্তমানে ইরানে আটকোটি ২০ লাখের বেশি লোক বাস করেন।

পাঁচ লাখ ৯১ হাজার বর্গমাইল ভূখণ্ড নিয়ে ইরান, সেখানে প্রতিবেশী ইরাকের বিস্তৃতি এক লাখ ৬৮ হাজার বর্গমাইল।

২০০৫ সালের এক হিসাব বলছে, ইরাক আগ্রাসনের আগে দেশটির সেনাবাহিনীর সদস্য ছিল সাড়ে চার লাখ। কিন্তু সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, ইরানের পাঁচ লাখ ২৩ হাজার সক্রিয় সামরিক সদস্য রয়েছে। এছাড়াও আড়াই লাখ অনিয়মিত সদস্যের কথা নাই উল্লেখ করলাম।

একইভাবে ইরানের অবস্থানও কম গুরুত্বপূর্ণ না। ইরাকের চেয়ে ইরানের নৌশক্তি আরও বেশি। দেশটির উত্তরে কাসফিয়ান ও পারস্য সাগর। আর দক্ষিণে ওমান উপসাগর।

এছাড়া কয়েকটি অস্থিতিশীল মার্কিন মিত্রের সঙ্গে ইরানের সীমান্ত রয়েছে। যার মধ্যে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, তুরস্ক ও ইরাক উল্লেখযোগ্য।

ঠিক ইউরোএশিয়ার মাঝে রয়েছে ইরান, এতে ব্যবসা-বাণিজ্যে দেশটির গুরুত্ব অপরিসীম। ইরান ও ওমান সীমান্তের হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ তেলট্যাংকার চলাচল করে। আরও ছোট করে দেখলে, এই জাহাজ রুট অন্তত দুই মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত। যদি এটি বন্ধ করে দেয়া হয়, তবে বৈশ্বিক তেল রফতানি ৩০ শতাংশের বেশি কমে যাবে।

প্রচলিত যুদ্ধের শক্তির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের খুবই বেশি দুর্বল ইরান। কিন্তু দেশটির দীর্ঘ অনুসৃত কৌশলের কারণে এ অঞ্চলের মার্কিন স্বার্থ ব্যাপকভাবে ক্ষতির মুখে পড়বে।

দেশের বাইরে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য নিয়মিত বাহিনী থেকে আলাদা ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেইর অনুগত বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর একটি শাখা হচ্ছে আল কুদস ফোর্স। ইরাক, লেবানন ও সিরিয়ায় ছায়াযুদ্ধ চালাতে এটি সহায়তা করে।

হিজবুল্লাহ আন্দোলনকে তারা তহবিল যোগান দেয়। নিজস্ব চেষ্টার বলেই হিজবুল্লাহ সফল হয়েছে। এর আগে আমেরিকানদের ওপর হামলা চালাতে এসব বাহিনীকে ব্যবহার করেছে ইরান।

পেন্টাগনের সংশোধিত হিসেব বলছে, ২০০৩ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে ইরানি ছায়া বাহিনী অন্তত ৬০৮ মার্কিন সেনাকে হত্যা করেছে। কাজেই ইরাক ও আফগানিস্তানে ফের ব্যাপক বিপর্যয় ঘটাতে পারে ইরানের ছায়াবাহিনী।

যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের নৌবাহিনী সত্যিকার সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। কাজেই হরমুজ প্রণালী বন্ধ করতে ইরানের বড় বড় জাহাজ কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র লাগবে না। এই রুট দিয়ে বাণিজ্য বন্ধ করে দিতে ডুবোজাহাজ কিংবা মাইন ব্যবহার করলেই যথেষ্ট।

মার্কিন যুদ্ধমহড়া বলে দিচ্ছে, এই বাহিনীর বিরুদ্ধে স্পিডবোড আত্মঘাতী হামলা এবং ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ময়করভাবে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

২০০৭ সালের নৌগোয়েন্দা দফতরের প্রতিবেদন বলছে, বিপ্লবী গার্ডের নৌবাহিনী ইরানের নিয়মিত নৌশক্তি থেকে স্বতন্ত্র। তাদের ছোট ছোট দ্রুতগতির নৌযান পারস্য উপসাগর সুরক্ষায় অনেক বেশি ভূমিকা রাখার কথা জানিয়েছে।

এরপরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি প্রকল্পের আওতায় দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি রয়েছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেটিজ অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ভাষায়, মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বিস্তৃত ও বৈচিত্রপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি রয়েছে দেশটির।

ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির হুমকি সীমান্ত ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। হিজবুল্লাহ আন্দোলনের এক লাখ ৩০ হাজার রকেট রয়েছে বলে ধারনা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র যদি শেষ পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তবে দেশটির উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জনশক্তি বাড়াতে হবে। এছাড়া চীন ও রাশিয়াকে থামাতেও এ জনশক্তি ব্যবহার করা যাবে।

সোমবারে নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদন বলছে, ট্রাম্পের ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্যাট্রিক শানাহান মধ্যপ্রাচ্যে এক লাখ ২০ হাজার সেনা মোতায়েন করার পরিকল্পনা করেছেন।

ইরান যদি মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলা করে বসে কিংবা তাদের পরমাণু কর্মসূচি থেকে নিবৃত্ত করতে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ। এটা এমন এক দৃশ্যপট, যেটা যুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত না। কাজেই যুদ্ধ জড়াতে হলে আরও বেশি সংখ্যক সেনাবাহিনী লাগবে।

ইরাক আগ্রাসনে দেড় লাখ মার্কিন সেনা জড়িত ছিল। তাদের সঙ্গে মিত্রদেশগুলোরও কয়েক হাজার সেনা যোগ দিয়েছিল। ইরাক যুদ্ধের অর্থনৈতিক খেসারত ২০১৩ সালে দুই লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এছাড়া এতে ২০০৩ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত চার লাখ লোক নিহত হয়েছেন।

মার্কিন যুদ্ধ পরিকল্পনাবিদেরা এসব ভালোভাবেই জানেন। তবে ইরানের সঙ্গে সামরিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার চেয়ে যে কোনো ভালো বিকল্প নেই, তা কিন্তু মার্কিন সরকার বলতে পারছে না।

কারণ সেগুলো অবলম্বন করলে টেবিল থেকে সামরিক পদক্ষেপগুলো সরিয়ে ফেলতে হবে, তেহরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে কমিয়ে দিতে হবে চাপ।

এটা সত্যিই ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল, যাতে বেশ কয়েকটি মার্কিন মিত্রকে হতাশার অথৈ সাগরে ফেলে দেবে।

লেখক: অ্যাডাম টেইলর, মার্কিন দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্টোর পররাষ্ট্রবিষয়ক লেখক। লন্ডনে জন্ম নেয়া এই কলামনিস্ট ম্যানচেস্টার ও কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন