নায়করাজ রাজ্জাক আর নেই মক্কার হোটেলে আগুন, সরিয়ে নেয়া হলো ৬০০ হজযাত্রী মক্কার হোটেলে আগুন, সরিয়ে নেয়া হলো ৬০০ হজযাত্রীপুলিশ প্রতি পাসপোর্ট ভেরিফিকেশনে ঘুষ নেয় ৭৯৭ টাকা অনড় প্রধান বিচারপতি, দ্বিধাদ্বন্দ্বে সরকার
No icon

অল্প খরচে কিডনি ডায়ালাইসিস

বিক্রমপুরের রাঢ়িখাল গ্রামের আয়শা সিদ্দিকা ভোর সাড়ে পাঁচটায় ছেলে হোসাইন আহমেদ বাহাদুরকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন। সাড়ে সাতটার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডিতে গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে পৌঁছান। কিছুক্ষণ পরেই হাসপাতালের কর্মীরা কিডনি ডায়ালাইসিস কেন্দ্রে ছেলেকে নিয়ে যান। গতকাল শুক্রবার হাসপাতালে কথা হয় আয়শার সঙ্গে। জানালেন, ছেলের বয়স ১৮ বছর। তিন বছর আগে ছেলের কিডনি রোগ ধরা পড়ে। তখন ছেলে স্যার জে সি বোস ইনস্টিটিউট ও কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র ছিল। রোগ শনাক্ত হওয়ার পরই ডায়ালাইসিস (কৃত্রিম উপায়ে রক্ত পরিশোধন) শুরু হয় পুরান ঢাকার বেচারাম দেউড়ির একটি ডায়ালাইসিস কেন্দ্রে। সপ্তাহে ডায়ালাইসিসে লাগত ৫ হাজার ১০০ টাকা। আসা-যাওয়া এবং ওষুধের জন্য আরও প্রায় চার হাজার টাকা। ‘প্রতি সপ্তাহে ১০ হাজার টাকা ব্যয় করতে করতে আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি’, বলেন আয়শা।

মাস দুয়েক আগে আয়শার পরিবার জানতে পারে, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে ১ হাজার ১০০ টাকায় ডায়ালাইসিস করানো যায়। তারপর এই হাসপাতালে নিবন্ধন করে ডায়ালাইসিস শুরু হয় বাহাদুরের। কর্তৃপক্ষ পরিবারের নিঃস্ব অবস্থা জানার পর ডায়ালাইসিস হচ্ছে বিনা মূল্যে। আয়শা বললেন, ‘এখানে ডায়ালাইসিস ফ্রি, অন্যান্য পরীক্ষা ও ওষুধও ফ্রি।’ এখন তাঁদের আসা-যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো খরচ নেই।

হাসপাতালে কর্মরত জ্যেষ্ঠ মেডিকেল কর্মকর্তা কল্লোল কুমার কুন্ডু  বলেন, ডায়ালাইসিস কেন্দ্রে শয্যা আছে ১০০টি। প্রতিবার (এক পালায়) ৯০ জন রোগীর জন্য সূচি (শিডিউল) দেওয়া থাকে। প্রতিবার পাঁচজন রোগী বিনা মূল্যে ডায়ালাইসিস সেবা পায়। হোসাইন আহমেদ বাহাদুর এমনই একজন রোগী। ডায়ালাইসিস করতে সময় লাগে চার ঘণ্টা।

এ বছরের ১৩ মে এই ডায়ালাইসিস কেন্দ্র চালু হয়েছে। এখন দেশে এটি সবচেয়ে বড় ডায়ালাইসিস কেন্দ্র। প্রতিদিন তিন পালায় ২৩০ থেকে ২৪০ জন রোগী এখানে ডায়ালাইসিস করাতে পারে। এ পর্যন্ত ৬০০-এর বেশি রোগী নিবন্ধন করেছে। অধিকাংশ রোগীকে সপ্তাহে তিন দিন ডায়ালাইসিস করাতে হয়।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন বিশিষ্ট কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নেফ্রোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুহাম্মদ রফিকুল আলম। তিনি বলেন, ‘দেশে দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের মধ্যে অনেক কিডনি রোগী আছেন, যাঁদের নিয়মিত ডায়ালাইসিস প্রয়োজন। ডায়ালাইসিস দীর্ঘদিন চালিয়ে যেতে হয়। অথচ খরচ অনেক বেশি। তাই গণস্বাস্থ্যের উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে।’ তবে তিনি বলেন, বিনা মূল্যে বা স্বল্প মূল্যের কারণে চিকিৎসার মানে যেন ঘাটতি না থাকে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে কোনো না কোনো ধরনের কিডনি রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় দুই কোটি। তাদের মধ্যে কিডনি বিকল হয়েছে এমন রোগী আট লাখ। তাদের কিডনি ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপন দরকার। তবে এখন সব মিলিয়ে ডায়ালাইসিসের সুযোগ পাচ্ছে মাত্র ১৮ হাজার রোগী। দেশে সরকারি ও বেসরকারি ১০১ একটি কেন্দ্রে ডায়ালাইসিস করা হয়। দরকার কমপক্ষে এক হাজার কেন্দ্র।

এসব কেন্দ্রের মধ্যে সরকারের জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি হাসপাতালের ডায়ালাইসিস কেন্দ্রে এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডায়ালাইসিস কেন্দ্রে রোগীর খরচ সবচেয়ে কম। এই দুটি কেন্দ্র চলে ভারতের একটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্বে। প্রতিবার ডায়ালাইসিসের জন্য রোগীকে ৪০০ টাকা দিতে হয়, আর সরকার ভর্তুকি দেয় ১ হাজার ৭০০ টাকা। বেসরকারি সব কেন্দ্রে ব্যয় গড়ে দুই হাজার টাকার বেশি।

গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘রাজধানীর মিরপুরের কিডনি ফাউন্ডেশনে নিজে ডায়ালাইসিস করার সময় অন্য রোগীদের কাছ থেকে অসহায়ত্বের কথা জেনেছি। দেখলাম চিকিৎসা আছে, কিন্তু মানুষ চিকিৎসা পাচ্ছে না। মানুষের কাছে ডায়ালাইসিস সেবা সহজলভ্য করার জন্য আমি এই কেন্দ্র স্থাপন করার উদ্যোগ নেই।’ এই কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও কয়েকজন ব্যক্তি গণস্বাস্থ্যকে প্রায় ৩০ কোটি টাকা অর্থ সহায়তা দিয়েছে বলে তিনি জানান।

গতকাল শুক্রবার ছুটির দিনেও হাসপাতালে ভিড় ছিল। ভিড় মূলত ডায়ালাইসিস করাতে আসা রোগী এবং তাদের সঙ্গে আসা আত্মীয়স্বজনের কারণে। হাসপাতালের চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় ডায়ালাইসিস করা হয়। কেন্দ্রের মধ্যে রোগী, চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ান ছাড়া কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয় না।

এই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ৫০ জন স্বাস্থ্যকর্মী (নার্স ও টেকনিশিয়ান) ও ছয়জন চিকিৎসক প্রতি পালায় কাজ করেন। কেন্দ্রে হেপাটাইটিস বি ও হেপাটাইটিস সি আক্রান্ত রোগীদের ডায়ালাইসিস করার জন্য ১৭টি পৃথক শয্যা রয়েছে।

চার ঘণ্টার ডায়ালাইসিস শেষ করে বেলা সাড়ে ১১টায় কেন্দ্রের সামনে একটি চেয়ারে বসে কিছুটা বিশ্রাম নিচ্ছিলেন মঞ্জুরুল ইসলাম। জানালেন, তিনি রাজধানীর মোহাম্মদপুরের শেখেরটেক এলাকায় থাকেন। তিন সপ্তাহ হলো গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে ডায়ালাইসিস নেওয়া শুরু করেছেন। সপ্তাহে দুই দিন আসেন। প্রতিবারে খরচ হয় ১ হাজার ১০০ টাকা। জানালেন, আগে সরকারি ও বেসরকারি একাধিক হাসপাতালে ডায়ালাইসিস করিয়েছেন। তবে এই কেন্দ্রে মূল্য কম ও সেবার মান ভালো।

রোগীকে ডায়ালাইসিসের জন্য নিবন্ধন করার আগে তার আর্থিক অবস্থার মূল্যায়ন করে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। হতদরিদ্র মানুষের কাছ থেকে কোনো অর্থ নেওয়া হয় না। দরিদ্র মানুষের কাছ থেকে প্রতি সেশনের জন্য ১ হাজার ১০০ টাকা, মধ্যবিত্তের কাছ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয়। আর উচ্চবিত্ত বা ধনী রোগীদের কাছ থেকে নেওয়া হয় ৩ হাজার করে। চালু হওয়ার পর থেকে কেন্দ্রে আসা রোগীর মধ্যে দরিদ্র রোগীর সংখ্যা ১০০ জনও হয়নি।

জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘বেশ কিছু কারণে দরিদ্র রোগী আসছে না বলে আমাদের ধারণা। অনেকে জানে না যে বিনা মূল্যে এই চিকিৎসা পাওয়া যায়। অনেকের ঢাকার বাইরে থেকে আসা-যাওয়ার খরচ বহন করারই সামর্থ্য নেই। আমরা কমপক্ষে ২০০ দরিদ্র রোগীকে বিনা মূল্যে ডায়ালাইসিস করতে পারব।’ তিনি বলেন, সরকার বিদ্যুৎ, পানি ও চিকিৎসা সরঞ্জামের দাম কমালে আরও কম মূল্যে সেবা দেওয়া সম্ভব। এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘তবে ডায়ালাইসিস সমাধান না। একজন মানুষ সারা জীবন ডায়ালাইসিস করে যাবে, এটা খুব কষ্টকর। তাই আমরা কিডনি প্রতিস্থাপন শুরু করার কথা ভাবছি। এ ক্ষেত্রেও আমরা আর্থিক বিষয় বিবেচনায় রেখে সবচেয়ে কম মূল্যে কিডনি প্রতিস্থাপন করব। ২০১৮ সালে প্রতিস্থাপন শুরু হবে।’

একমাত্র ছেলের কষ্টের কথা বলতে বলতে আয়শা সিদ্দিকার চোখে পানি আসে। মা আর সন্তানকে কত দিন এই কষ্ট বয়ে বেড়াতে হবে, আয়শা তা জানেন না। ছেলের কিডনি প্রতিস্থাপন করাতে চান। কিন্তু তাতে কিডনি যেমন দরকার, দরকার অর্থেরও। দুটোই নাগালের বাইরে। অসহায় আয়শা। টপটপ করে ঝরে পড়া চোখের পানিতে ভিজে যায় হাসপাতালের মেঝে। বেলা একটার দিকে ছেলেকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে যান। আবার আসবেন কাল রোববার।