বর্জ্য অপসারণে কতটা প্রস্তুত ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন?ঈদের খুশি নেই, ছেলের কবরের পাশে বসে কাঁদছেন রিফাতের মানিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় প্রস্তুত শোলাকিয়াকোরবানির পশু জবাই ও মাংস প্রস্তুতে ২৫% খরচ বহন করবে ডিএনসিসিঈদের সকালে সর্বস্তরের জনগণের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন প্রধানমন্ত্রী
No icon

দুর্ঘটনা ও আঘাতে দেশে প্রতি ঘণ্টায় ১২ জন মানুষের মৃত্যু

সড়ক দুর্ঘটনায় আহত নোয়াখালী জেলার দক্ষিণ হাতিয়ার মুদিদোকানি পবন মজুমদার রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) চিকিৎসাধীন। ৩০ জুন চিকিৎসকেরা তাঁর ডান পা হাঁটুর ওপর থেকে কেটে ফেলেছেন। পা হারিয়ে পবন এখন প্রতিবন্ধী। পবনকে দেখাশোনার জন্য সঙ্গে আছেন ছোট ভাই মাধব মজুমদার। গত সোমবার মাধব বলেন, ৯ জুন সকাল ১০টার দিকে পবন মোটরসাইকেলে বাজারে যাচ্ছিলেন। রাস্তায় ইজিবাইকের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত হন তিনি। ডান পায়ের দুটি আঙুলসহ পায়ের হাড় ভেঙে যায়, হাঁটুর বাটি বেরিয়ে আসে। আহত পবনকে প্রথমে হাতিয়া উপজেলা হাসপাতালে নেওয়া হয়, তারপর ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ও শেষে পঙ্গু হাসপাতালে আনা হয়। ভাইয়ের দুর্ঘটনার কথা বলতে বলতে মাধব মজুমদার জানান, কয়েক বছর আগে নারকেলগাছ থেকে পড়ে মাধব নিজে মারাত্মক আহত হয়েছিলেন। তাঁর বাঁ হাতের হাড় ভেঙে যায়। বাঁ হাত দেখিয়ে বলেন, অনেক খরচ হলেও হাত সোজা হয়নি। কথায় কথায় মাধব তাঁর অন্য দুই ভাইয়ের দুর্ঘটনার কাহিনিও শোনালেন। ২০০০ সালে ধানমাড়াইয়ের যন্ত্রের আঘাত লাগে সেজ ভাই যাদব মজুমদারের ডান চোখে। সেই চোখ আর ভালো হয়নি, ডান চোখ দৃষ্টিহীন। আর মেজ ভাই লক্ষ্মণ মজুমদার ২০০৭ সালে আত্মহত্যা করেন।

দক্ষিণ হাতিয়ার এই পরিবার যেন বাংলাদেশের দুর্ঘটনা পরিস্থিতির প্রতিনিধিত্ব করছে। দুর্ঘটনা বিষয়ে ২০১৬ সালের সর্বশেষ জাতীয় জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দুর্ঘটনা ও আঘাতের কারণে দেশে প্রতি ঘণ্টায় ১২ জন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। আর প্রতি ঘণ্টায় আহত হচ্ছে ২ হাজার ২৮৭ জন। মারাত্মক আহত ব্যক্তিদের মধ্য থেকে প্রতি ঘণ্টায় প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ছে ২৮ জন।

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ও দুর্ঘটনা জরিপ ২০১৬ শিরোনামের এই জরিপ করেছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি)। জরিপের একটি সারসংক্ষেপ প্রকাশ করলেও মূল প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।

জরিপের সঙ্গে জড়িত ছিলেন সিআইপিআরবির ডাটা ব্যবস্থাপনা শাখার প্রধান ড. মো. আবু তালেব। তিনি বলেন, দুর্ঘটনা, আঘাত বা জখম বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যা। পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রে এর প্রভাব অনেক গভীরে। শুধু সড়ক দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা ও পানিতে ডোবার ঘটনার অতি ক্ষুদ্র অংশ সম্পর্কে মানুষ জানতে পারে। বাস্তব ঘটনা অনেক বড় ও পরিস্থিতি ভয়াবহ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৩টি বিষয়কে দুর্ঘটনা, আঘাত বা জখমের মধ্যে ফেলেছে। এগুলো হচ্ছে আত্মহত্যা, সড়ক দুর্ঘটনা, পড়ে যাওয়া, ধারালো বস্তু দ্বারা কেটে যাওয়া, পড়ন্ত বস্তুর আঘাত, পুড়ে যাওয়া, প্রাণী ও কীটপতঙ্গের কামড় ও আঘাত, সহিংসতা, পানিতে ডোবা, মেশিন বা যন্ত্রপাতির আঘাত, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট, দুর্ঘটনাজনিত শ্বাসরোধ ও দুর্ঘটনাজনিত বিষপান। জরিপে এসব বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

জরিপের জন্য দৈবচয়নের মাধ্যমে ১৬টি জেলা বেছে নেওয়া হয়েছিল। এসব জেলার শহর ও গ্রামের ৭০ হাজার পরিবারের ২ লাখ ৯৯ হাজার ২১৬ জন সদস্যের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল। ২০১৬ সালের মার্চ থেকে জুনের মধ্যে জরিপের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল।

জরিপের ফল বলছে, বছরে নানা দুর্ঘটনায় মারা যায় ১ লাখ ৮ হাজের হাজারের বেশি মানুষ। এদের মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ৪৫ হাজার। সব বয়সীদের মধ্যে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর প্রধান চারটি কারণ আত্মহত্যা, সড়ক দুর্ঘটনা, পানিতে ডোবা ও পড়ে যাওয়া। আত্মহত্যা নারীদের মধ্যে বেশি। অন্যদিকে দুর্ঘটনায় বছরে ২ কোটির বেশি মানুষ আহত হয়, এদের মধ্যে ২ লাখ ৪২ হাজার স্থায়ীভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ে। দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ধরে নিয়ে দুর্ঘটনার অনুমিত হিসাব দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা জানিয়েছেন।

মৃত্যুর মিছিল
জরিপ বলছে, বিভিন্ন দুর্ঘটনা ও আঘাতে বছরে প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। অর্থাৎ দিনে ২৯৮ জনের বা ঘণ্টায় ১২ জনের মৃত্যু হচ্ছে। বৃদ্ধদের বেশি মৃত্যু হয় পড়ে গিয়ে। জরিপ প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ১৮ বছরের কম বয়সী সাড়ে ৪৫ হাজারের বেশি শিশু প্রতিবছর মারা যায়, অর্থাৎ দিনে মারা যায় ১২৫ জন। এই বয়সীদের ৩৭ শতাংশ পানিতে ডুবে মারা যায়। এই বয়সীদের মৃত্যুর অন্য প্রধান কারণগুলোর মধ্যে আছে আত্মহত্যা, সড়ক দুর্ঘটনা ও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট। দুর্ঘটনা বা আঘাতের কারণে প্রাপ্তবয়স্কদের বেশি মৃত্যু হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায়, আত্মহত্যা করে ও পড়ে গিয়ে। এই তিন কারণে প্রতিদিন ১৭০ জনের মৃত্যু হচ্ছে। একই ধরনের জরিপ হয়েছিল ২০০৩ সালে। দুটো জরিপের ১৮ বছরের কম বয়সীদের মৃত্যুর তথ্য পাশাপাশি রেখে দেখা গেছে, পানিতে ডুবে ও প্রাণীর কামড় এই দুটি ছাড়া অন্য সব কারণে মৃত্যু বেড়েছে। ২০০৩ সালে দৈনিক ৮৩ জনের মৃত্যু হতো। এখন হচ্ছে ১২৫ জনের।

এই বয়সীদের আত্মহত্যা, সড়ক দুর্ঘটনা, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট, পড়ে যাওয়াসহ অন্য প্রতিটি ক্ষেত্রেই মৃত্যু আগের চেয়ে বেড়েছে।